ভিন দেশের ভূত
মিজোরামের ভয়াল পথ

রাত যত বাড়ে, পাহাড়ি রাস্তাটা তত নিঃশব্দ হয়ে আসে। হেডলাইটের আলোয় যতটুকু দেখা যায়, শুধু ততটুকুই যেন পৃথিবী। দুপাশে ঘন জঙ্গল। সামনে একের পর এক বাঁক। মাঝেমধ্যে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। তারপর হঠাৎ মনে হলো, পেছনের সিটে কেউ যেন নড়ে উঠল। ফিরে তাকালেন। কেউ নেই। মিজোরামের কাওনপুই দাইয়ের গল্পে এমন দৃশ্য নতুন নয়।
জঙ্গলের অন্ধকারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্মৃতিফলক। সেখানে লেখা রয়েছে বহু মানুষের নাম। তারা সবাই মারা গিয়েছিলেন এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায়। ১৯৮০-এর দশকে বড়দিনের ছুটির সময়ে সমতল এলাকা থেকে বহু ছাত্রছাত্রী আইজলের দিকে ফিরছিলেন। তাদের বহনকারী একটি বাস কাওনপুইয়ের কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে। মৃত্যু হয় বহু মানুষের। নিহতদের নাম লেখা রয়েছে স্মৃতিফলকে। দিনের আলোয় সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, এ শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মারক।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে?
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া নির্জন রাস্তা। চারপাশে নিস্তব্ধতা। আর কয়েক ফুট দূরে একসঙ্গে লেখা এতগুলো মৃত মানুষের নাম। ভয় তৈরি হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি আর কী-ইবা দরকার?
কাওনপুই দাইয়ের সবচেয়ে পুরনো গল্পগুলোর একটি নাকি বাসচালকদের মুখে শোনা যায়। গভীর রাতে খালি বাস নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চালক হঠাৎ পেছন থেকে মানুষের কথাবার্তার শব্দ শুনেছেন। কেউ যেন নিচু গলায় কথা বলছে। কখনো মনে হয়েছে, পেছনের সিটে কেউ নড়ছে।
চালক বাস থামিয়েছেন। আলো জ্বালিয়েছেন। পেছনে তাকিয়েছেন। কেউ নেই।
আবার একটি গল্পে বলা হয়, রাস্তার ধারে রাতে কোনো অচেনা মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। গাড়ি থামালে তিনি উঠে বসেন। কিছুদূর যাওয়ার পর চালক পেছনে তাকিয়ে দেখেন— সিট ফাঁকা।
কাওনপুই দাইয়ের গল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় অধ্যায়টি আরও অদ্ভুত।
সময়টা ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিক বলে স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।
এক ব্যক্তি নাকি ভূতের গল্পে বিশ্বাস করতেন না। এক রাতে তাকে একা মোটরসাইকেলে কাওনপুই দাইয়ের রাস্তা দিয়ে যেতে হচ্ছিল। রাত গভীর। স্মৃতিফলকের কাছে এসে তিনি কিছুক্ষণের জন্য মোটরসাইকেল থামালেন। চারপাশে তাকালেন। কিছুই অস্বাভাবিক মনে হলো না। আবার রওনা দিলেন। জঙ্গলের ভেতর কিছুটা এগিয়ে একটি বাঁকের কাছে হঠাৎ চোখে পড়ল এক তরুণী।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। লোককথার বর্ণনায়, মেয়েটির গায়ে কোনো পোশাক ছিল না। লোকটি মোটরসাইকেল থামালেন।
জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
উত্তর নেই। শুধু কান্না।
বিপদে পড়েছে ভেবে নিজের জ্যাকেট খুলে দিলেন তাকে। তারপর মোটরসাইকেলের পেছনে বসালেন।
‘কোথায় যাবেন?’
মেয়েটির উত্তর—
‘খাতলা।’
মোটরসাইকেল চলল।
পাহাড়ি রাস্তা। দুপাশে জঙ্গল। পেছনে বসে মেয়েটি বারবার একই শব্দ বলছে—
‘খাতলা...’
হঠাৎ চালক পাশের আয়নায় তাকালেন।
মেয়েটি হাসছে। সাধারণ হাসি নয়। সেই হাসি মুখের প্রায় দুপ্রান্ত পর্যন্ত ছড়ানো। জিভ বেরিয়ে আছে। তারপর আচমকা চিৎকার—‘খাতলা!’
আতঙ্কে লোকটি পেছনে বসা মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন।
মেয়েটি চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে তার পেছনে ছুটতে শুরু করেছিল।
আর বারবা বলছে—
‘খাতলা! খাতলা!’
লোকটি আর পেছনে তাকাননি।
মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে সোজা বাড়ির দিকে ছুটেছিলেন।
বাড়িতে পৌঁছে তিনি এতটাই আতঙ্কিত ছিলেন যে কিছুক্ষণ ঠিক করে কথাও বলতে পারেননি।
ধীরে ধীরে তিনি স্বাভাবিক হন।
কয়েক দিন পর তিনি খাতলা এলাকার পরিচিত কয়েকজনের কাছে জানতে চান, পুরনো সেই বাস দুর্ঘটনায় তাদের এলাকার কোনো তরুণী মারা গিয়েছিলেন কি না।
স্থানীয়দের প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, উত্তর ছিল— হ্যাঁ।
ছিলেন একজন। এর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই তরুণীর কবরের কাছে।
সেখানেই নাকি অপেক্ষা করছিল গল্পের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দৃশ্য।
কবরের পাশে ঝুলছিল একটি জ্যাকেট। গল্প বলে, সেটিই সেই জ্যাকেট, যেটি ওই রাতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির গায়ে দিয়েছিলেন তিনি।



