অশরীরী জগৎ
নিশি ভূত

আঁকা : সোহানুর রহমান
বাংলা লোককথায় ‘নিশি’ বা ‘নিশি ভূত’ নামে এক অশরীরী আত্মার কথা প্রচলিত আছে। ‘নিশি’ শব্দটি এসেছে রাত বা অন্ধকার থেকে, আর ‘ডাক’ অর্থ কাউকে আহ্বান করা। পূর্ব ভারতের বাংলা, বিহার ও ঝাড়খন্ড অঞ্চলে এই অশরীরী আত্মা সম্পর্কে নানা রোমহর্ষক কাহিনি প্রচলিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নিশি হলো সেসব অতৃপ্ত আত্মা, যারা অপঘাতে বা অকালে মারা গেছে এবং যাদের শেষকৃত্য বা পিণ্ডদান সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। গভীর রাতে এই ভূত মানুষের নাম ধরে ডাকে। ডাকটি সাধারণত আসে পরিচিত মানুষের কণ্ঠে। ফলে শুনে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে এটি কোনো মানুষের ডাক নয়।
লোকবিশ্বাসে, নিশির ডাকে সাড়া দেওয়া মানুষ ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। এরপর সে যেন একধরনের ঘোর বা সম্মোহনের মধ্যে চলে যায়। বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। নিশির শিকার হওয়া অধিকাংশ মানুষের দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নিশি সাধারণত অমাবস্যার রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাধারণত পুরুষদের তার লক্ষ্যবস্তু বানায়। কখনো কখনো নিশি মানুষকে মায়াবী কোনো রূপ দেখিয়ে বা প্রলোভনে ফেলে ঘর থেকে দূরে নিয়ে যায়। অনেক সময় শিকারের প্রতি মায়া জন্মালে সে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে যায়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার পরিণতি হয় মর্মান্তিক।
লোকজ বিশ্বাস ও গ্রামবাংলার প্রবীণদের মতে, নিশিকে চেনার একটি অব্যর্থ উপায় রয়েছে। বলা হয়, নিশি কখনো কাউকে তিনবার নাম ধরে ডাকতে পারে না। সে তার মায়াবী কণ্ঠে সর্বোচ্চ দুবার ডাক দিতে সক্ষম। তাই রাতে অপরিচিত বা পরিচিত কণ্ঠে কেউ নাম ধরে ডাকলে প্রথম বা দ্বিতীয় ডাকে সাড়া না দিয়ে অপেক্ষা করা উচিত। তৃতীয়বার ডাক শোনার পরই নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেটি কোনো মানুষ। এ ছাড়া নিশি কখনো মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না। কিছু লোককথায় বলা হয়, অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কোনো কোনো তান্ত্রিক নিশি পুষে রাখেন, অর্থাৎ নিশিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করে কাউকে ক্ষতি করার বিশ্বাসও লোকমুখে প্রচলিত।
বাংলার বাইরে একই ধরনের কিছু লোকবিশ্বাসের ভিন্ন রূপও দেখা যায়। ভারতের কর্ণাটকে ‘নালে বা’ নামে এমন এক আত্মার গল্প রয়েছে। ‘নালে বা’ কথাটির অর্থ ‘আগামীকাল এসো’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এটি বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন গলিতে ঘুরে বেড়ায় এবং মানুষকে তার শিকার বানানোর চেষ্টা করে। পরিচিত মানুষের কণ্ঠে ডেকে মানুষকে ঘরের বাইরে বের করে আনে।



