এক ‘অভিশপ্ত’ গানের গল্প

টিনি টিম
‘টিপটো থ্রু দ্য টিউলিপস’ গানাটিকে ইন্টারনেটে অনেকে ‘অভিশপ্ত’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রশ্ন হলো, একটি নিরীহ প্রেমের গান কীভাবে এই তকমা পেল?
গানটির সুর করেছিলেন জো বার্ক, কথা লিখেছিলেন অ্যাল ডুবিন। ১৯২৯ সালে ‘গোল্ড ডিগার্স অব ব্রডওয়ে’ চলচ্চিত্রে নিক লুকাস গানটি গানটি গেয়ে জনপ্রিয়তা পান। দর্শক নিক লুকাসের সুন্দর, মিষ্টি কণ্ঠে গানটি শুনে মুগ্ধ হয়েছিল। তখন এটি ছিল কেবলই বসন্তের ফুল, প্রেম আর কোমল আবেগের গান। গানটির ভাগ্য বদলে যায় প্রায় চার দশক পর। ১৯৬০-এর দশকে নিউ ইয়র্কের ক্লাবে এক অদ্ভুত শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে। লম্বা চুল, অদ্ভুত আকৃতির বড় নাক, হাতে ছোট্ট চার তারের বাদ্যযন্ত্র। তার নাম টাইনি টিম, আসল নাম হারবার্ট কোরি। ১৯৬৮ সালে তিনি এই গান রেকর্ড করেন এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘লাফ-ইন’-এ গেয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান।
মানুষ যে স্বরে কথা বলে বা গান গায়, সেখানে গলার স্বরতন্ত্রী স্বাভাবিকভাবে কাঁপে। কিন্তু ফ্যালসেটোতে (কৃত্রিম উচ্চস্বরে) স্বরতন্ত্রী টানটান ও পাতলা হয়ে যায় এবং মূলত এর প্রান্তের অংশ কাঁপে। এতে গলার স্বর অনেক উঁচুতে ওঠে, তবে আওয়াজটা শোনায় হালকা, পাতলা ও কিছুটা বাঁশির মতো। টাইনি টিম প্রায় পুরো গানটাই এই স্বরে গাইতেন। গভীর পুরুষালি স্বরের একজন মানুষের মুখ থেকে হঠাৎ শিশুসুলভ, কাঁপা কাঁপা সুর বেরোলে শ্রোতাদের মনে একটা অস্বস্তিকর ধাক্কা লাগে। তার অদ্ভুত সাজপোশাক আর কণ্ঠের কারণেও বিতর্ক তৈরি হয়। কেউ তাকে পছন্দ করত, আবার কেউ ভয় পেত। এই দ্বৈত অনুভূতিই গানটির ‘অভিশপ্ত’ ভাবমূর্তির বীজ বুনে দেয়।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে ম্যাসাচুসেটসের একটি ছোট্ট উৎসবে গাইতে গিয়ে টাইনি টিম হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ৩০ নভেম্বর মিনিয়াপোলিসের এক দাতব্য অনুষ্ঠানে তিনি আবার মঞ্চে ওঠেন এবং ‘টিপটো থ্রু দ্য টিউলিপস’ গাইতে শুরু করেন। গাইতে গাইতেই তার আবার হার্ট অ্যাটাক হয়! হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। অনেকে তাই বলতে শুরু করল, গানটির মধ্যে কোনো রহস্যময় শক্তি আছে। এরপর হলিউড এই গানটিকে পাকাপাকিভাবে একটি অভিশপ্ত গানের রূপ দিয়ে দিল। ২০১০ সালের চলচ্চিত্র ‘ইনসিডিয়াস’-এ গানটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে মিষ্টি সুরের পেছনে অশুভ কিছুর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যে দৃশ্যে গানটি বাজে, সেখানে এক ভয়ংকর লাল মুখের প্রেতাত্মা নাচতে থাকে।
২০১৩ সালের পর থেকে ইন্টারনেটে গানটি নিয়ে গুজবের মাত্রা হুট করেই বেড়ে যায়। ইউটিউবে অসংখ্য ভিডিও আর গল্প ছড়িয়ে আছে এই গান নিয়ে। কিছু মানুষের নাকি অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতাও হয়েছে গানটির কারণে। কেউ বলে, মধ্যরাতে অন্ধকার ঘরে একা গানটি শুনলে নাকি পেছনে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়; আবার কারও কারও মতে, পুরনো রেকর্ডে গানটি বাজালে মাঝপথে সুর আপনাআপনি বদলে যায় বা গান থেমে যায়!
নিউ ইয়র্কের এক তরুণ ইউটিবারের মতে, একবার শুরু করলে গানটি শেষ পর্যন্ত শুনতে হয়, মাঝপথে থামালে দুর্ভাগ্য পিছু নেয়। গভীর রাতে টিউলিপ বাগানে হাঁটতে হাঁটতে এই গান করলে নাকি সত্যিই অন্য জগৎ থেকে প্রেতাত্মারাও নেমে আসে।
এমিলি কার্টার নামের এক তরুণী বলেন—
‘২০১৯ সালের অক্টোবর। ওহাইওর ডেটন শহর থেকে একটু বাইরে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে একাই থাকতাম। ওঠার প্রায় তিন সপ্তাহ পর এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল একটা গানের শব্দে। কিন্তু কিছুক্ষণ শোনার পর বুঝলাম, শব্দটা আসছে নিচতলা থেকে। খুব মিহি, অদ্ভুত একটা পুরুষ কণ্ঠ গাইছিল ‘টিপটো থ্রু দ্য টিউলিপস...’। পুরনো রেকর্ড বাজলে যেমন খসখসে ও কাঁপা কাঁপা শব্দ হয়, ঠিক তেমন শোনাচ্ছিল। অথচ আমার বাড়িতে কোনো রেকর্ড প্লেয়ার ছিল না। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছাতেই গানটা হঠাৎ থেমে গেল। পরদিন বাড়িওয়ালাকে ঘটনাটা বলেছিলাম। তিনি প্রথমে কিছু বলেননি। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন গান শুনেছিলে?’
আমি বললাম, ‘টিপটো থ্রু দ্য টিউলিপস।’
ভদ্রলোকের মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। তিনি জানালেন, আমার আগে যে বৃদ্ধা ওই বাড়িতে থাকতেন, তিনি প্রায় প্রতি রাতেই গানটা বাজাতেন। ওই বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়েছিল।
তিন রাত পর আবার সেই গানে আমার ঘুম ভাঙল। এবার শব্দটা আসছিল আমার শোবার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে। আমি প্রায় এক মিনিট বিছানায় বসে শুনেছিলাম। তারপর সাহস করে আলমারির দরজা খুললাম। ভেতরে কেউ ছিল না। শুধু মেঝেতে পড়ে ছিল একটা শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া টিউলিপ ফুল। আমি পরদিনই বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’



