ভিন দেশের ভূত
অভিশপ্ত পর্বত

কালো ঘন অন্ধকার রাত। পাকিস্তানের কোয়েটা উপত্যকার চারপাশ জুড়ে হিমশীতল নীরবতা। কিন্তু সেই বিষণ্ণ নীরবতা চিরে কোহ-ই-চিলতান পর্বতের রুক্ষ চূড়া থেকে হঠাৎ ভেসে আসে এক বুকফাটা কান্না।
এই গা ছমছমে কান্নার পেছনে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দী পুরনো এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। ব্রাহুই ভাষার শব্দ ‘চিলতান’ বা ‘চেহেল-তান’-এর সরাসরি অর্থ হলো ‘চল্লিশটি শরীর’। লোকগাথা অনুযায়ী, একসময় এ অঞ্চলে বাস করত এক দরিদ্র, দীর্ঘকাল সন্তানহীন দম্পতি। সন্তান লাভের আকুল আশায় তারা বছরের পর বছর ঘুরেছেন বহু দরগাহ ও সাধু-সন্ন্যাসীর দুয়ারে। অবশেষে এক দরবেশের প্রার্থনায় তাদের কোল আলো করে এলো সন্তান, কিন্তু একটি বা দুটি নয়— একসঙ্গে ৪০টি নিষ্পাপ শিশু! চরম দারিদ্র্যের সামনে দাঁড়িয়ে এত শিশুর মুখে আহার তুলে দেওয়া ওই দম্পতির জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে বাবা চরম এক সিদ্ধান্ত নেন; ৩৯টি শিশুকে কেবল কাপড়ে মুড়িয়ে ফেলে দিয়ে আসেন কোহ-ই-চিলতানের ভয়াল, নির্জন পাহাড় চূড়ায়।
দিন যায়, মাতৃত্বের ব্যাকুল টানে মা আর স্থির থাকতে পারলেন না। কোলে থাকা ৪০ নম্বর শিশুটিকে নিয়ে তিনি পাহাড়ের দুর্গম পথ বেয়ে ওপরে ছোটেন। কিন্তু গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন— ৩৯টি শিশুই অলৌকিকভাবে বেঁচে আছে এবং পাহাড়ি পাথরের মাঝে খেলা করছে! খুশিতে আত্মহারা হয়ে মা তার কোল খালি করে ৪০ নম্বর শিশুটিকেও ভাইদের কাছে রেখে দ্রুত ঘরে ছোটেন স্বামীকে এ সুসংবাদ দিতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর স্বামী-স্ত্রী পাহাড়ে ফিরে এসে দেখলেন, ৪০টি শিশুর একটিও সেখানে নেই; যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে তারা!
স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস, পাহাড়ের কঠিন ও বরফশীতল পাথরে যে শিশুদের করুণ মৃত্যু ঘটেছিল, তারা আর কখনো এ পর্বত ছেড়ে যায়নি। আজ শত শত বছর পরও তাদের আত্মারা ঘুরে বেড়ায় এ পর্বতমালার আনাচে-কানাচে। রাত গভীর হলে শোনা যায় সেই শিশুদের আর্তনাদ। পাহাড়ে রাতে ক্যাম্পিং করা অনেক অভিযাত্রী দাবি করেন, ঘন কুয়াশা আর চাঁদের আলো-আঁধারিতে তারা পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ছায়া-অবয়ব ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। আবার অনেক সময় নাকি দূর থেকে মিষ্টি কণ্ঠে শিশুর নাম ধরে ডাক শোনা যায়, যা শুনে সামনে এগোলেই পথভোলা পথিক পড়ে যায় হাজার ফুট গভীর খাদে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ের অদ্ভুত প্রাকৃতিক গঠন, গভীর ফাটল ও খাড়া গুহাগুলোর মধ্য দিয়ে যখন তীব্র বেগে পাহাড়ি বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এক ধরনের তীক্ষ্ণ শিস ও কান্নার মতো শব্দের সৃষ্টি হয়। তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যাই থাক না কেন, স্থানীয়দের কাছে এটি আজও সেই অভিশপ্ত সন্তানদেরই কান্না।



