বর্ষার রাতের গোলকধাঁধা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চাঁদপুরে রাতের নৌভ্রমণে ব্যাখ্যাতীত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল কয়েক কিশোর-তরুণ। সেই অভিজ্ঞতা পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন তাদেরই একজন রাজীব আহমেদ
বহু বছর আগের কথা। ১৮-১৯ বছর বয়স তখন আমার। ঢাকায় থাকি তখনো। ওই সময় আমি ও আমার কাজিন মাসুদ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর গিয়েছিলাম আরেক ছোট কাজিনকে ঢাকায় বেড়াতে আনতে।
আমাদের গ্রামের বাড়িটি গোমতী ও ডাকাতিয়া নদীর কাছাকাছি একটি নিচু অঞ্চলে অবস্থিত। প্রতি বছর বর্ষাকালে পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যেত। এই প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে যুগ যুগ আগে আমাদের বংশের মুরব্বিরা মাটি কেটে উঁচু করে ‘ভিটা’ তৈরি করেছিলেন। ২০০ থেকে ৫০০ বিঘা পর্যন্ত বিস্তৃত এসব ভিটাই আমাদের বংশের বসতি। বর্ষার সময় চারপাশ ডুবে গিয়ে ভিটাগুলো দ্বীপের মতো জেগে থাকে। ওই অঞ্চলে তখনো আধুনিক উন্নয়নের ছোঁয়া সেভাবে পৌঁছায়নি; কুপির টিমটিমে আলো আর অজস্র গাছপালায় ঘেরা ভিটাগুলোর চারপাশ এক অন্যরকম আবহ তৈরি করত।
ফুফুর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা নিয়ে আমরা নৌকায় করে সেই দূরের ভিটায় পৌঁছাই। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে আসে। পরের দিন ঢাকায় আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকায় সেদিন রাতেই ১০-১১টার লঞ্চ ধরার তাড়া ছিল। খবরাখবর নিয়ে জানলাম, আমাদের আরেক ফোর্থ কাজিন সৈকতও আমাদের সঙ্গে লঞ্চঘাট পর্যন্ত যাবে। আমরা চারজন কাজিন— আমি, মাসুদ, ছোট কাজিন ও সৈকত একটি ছোট নৌকায় রওনা দিলাম। আকাশ মেঘে ঢাকা, ঝড়ের পূর্বাভাস। গন্তব্য মূল বাঁধের রাস্তা, যেখান থেকে ঢাকার লঞ্চ ধরতে হবে। পরের দিন সকালে ঢাকায় আমার একটি জরুরি পরীক্ষা থাকায় লঞ্চ মিস করা যাবে না। গ্রামবাংলা তখন আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে বহুদূরে; কুপির টিমটিমে আলোয় মোড়া চারপাশ। নৌকার লগি বাঁশের ছপছপ শব্দ আর মাঝেমধ্যে দূরের প্যাঁচার ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। আকাশে ঘনায়মান মেঘের গর্জন আমাদের বুক কাঁপিয়ে তুলছিল। কাজিনদের মনে সাপের ভয় থাকলেও আমার মনে ভিড় করেছিল অন্য এক অজানা আশঙ্কা।
নৌকা যত এগোতে লাগল, পরিবেশ ততই থমথমে ও গা ছমছমে হয়ে উঠতে লাগল। চারপাশের কালো জলের চাদর ভেদ করে দূর থেকে ভেসে আসা বিভিন্ন ভিটার ছায়াগুলো প্রেতাত্মার মতো মনে হচ্ছিল। মাঝপথে হঠাৎ করেই আমাদের নৌকার গতি শ্লথ হয়ে গেল। বৈঠা বা লগি টানার সময় মনে হতে লাগল, পানির নিচে কেউ যেন নিচের দিক থেকে নৌকাটিকে খামচে ধরে আছে। ঠিক তখনই জলের তলদেশ থেকে অদ্ভুত এক শব্দে বুদ্বুদ উঠতে শুরু করল। কৌতূহলী ও আতঙ্কিত হয়ে সৈকত টর্চ ফেলল জলের গভীরে।
কেউ যেন নিচের দিক থেকে নৌকাটিকে টেনে ধরে আছে। ঠিক তখনই জলের তলদেশ থেকে বুদ্বুদ উঠতে শুরু করল
সেই আলোর বৃত্তে যা ভেসে উঠল, তা দেখে আমাদের রক্ত জমে গেল। নিকষ কালো জলের নিচ থেকে বুদবুদের সঙ্গে ভেসে উঠছে পোড়া কাপড়ের ছাইরঙা অবশিষ্টাংশ এবং মানুষের কিছু সাদা হাড়গোড়! মুহূর্তেই হাড়হিম করা এক আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলাম আমরা। সৈকত থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘ভাই, আমরা ভুল করে শ্মশানের কাছাকাছি চলে এসেছি!’
কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর, আরও ভারী হয়ে আমাদের চেপে ধরল। বাতাসের গতি একেবারে থমে গেল। নৌকার নিচের জল সাধারণ পানির মতো মনে হচ্ছিল না; তা যেন গাঢ় কালো ও রহস্যময় কিছু একটা। কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই মনের ভেতর এক অচেনা, সর্বগ্রাসী ভয়ের শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। যা কেবল সাপ বা অন্ধকারের ভয় নয়, বরং কোনো এক অদৃশ্য অতিলৌকিক শক্তির উপস্থিতি। কারও মুখ দিয়েই কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। হাফেজ সৈকত তখন দিশাহারা হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় উচ্চ স্বরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শুরু করল। পবিত্র আয়াতের সেই ধ্বনিতে চারপাশের জমাট বাঁধা ও ভারী বাতাস যেন সামান্য হালকা হলো। তেলাওয়াতের তেজে নাকি আমাদের মনোবল ফেরায়, ভয়ের ঘোরটা কিছুটা কাটল। আমরা কাঁপা হাতে আবার লগি বাইতে শুরু করলাম।
কিছুক্ষণ পর নদীর বুক চিরে দূরে একটি আলোর বিন্দু নজরে এলো। প্রথমে কুপি ভেবে ভুল করলেও দ্রুত বুঝতে পারলাম, ওটি কোনো চলমান যানবাহনের বাতি— বাঁধের রাস্তার সিএনজি বা বেবিট্যাক্সি। আমরা নতুন উৎসাহে, প্রাণপণ শক্তিতে লগি টানতে লাগলাম, মনে হলো এই তো একটু পরেই পৌঁছে যাব সভ্যতার ছোঁয়ায়। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা মানুষের বোধগম্যতার সম্পূর্ণ বাইরে। আমরা একটানা লগি বেয়েই চললাম, কিন্তু সেই বাঁধের রাস্তা আর আমাদের সামনে আসে না। যতদূরই যাই, দূরত্ব যেন আর কমে না। ওই অদ্ভুত চলমান আলোটা অনন্তকাল ধরে যেন একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর আমরাও এক অদৃশ্য গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়েছিলাম। সময় যেন সেখানে থমে গিয়েছিল।
আমরা ক্লান্তিতে নুয়ে পড়লাম, ঘামে ভিজে গেল আমাদের শরীর, অথচ গন্তব্য ফুরায় না। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো প্রেতাত্মার জাদুকরী বলয়ে আটকে গেছি, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। বুকচাপা আতঙ্ক যখন আবার আমাদের গ্রাস করতে উদ্যত হলো, আমি সৈকতকে আবারও কোরআন তেলাওয়াত করতে বললাম। সৈকত কাঁপতে কাঁপতে আবার উচ্চ স্বরে আয়াত পড়তে শুরু করল।
কতক্ষণ কেটেছিল কে জানে! তেলাওয়াতের একটানা গুঞ্জনের মধ্যে হঠাৎ খেয়াল করলাম, চারপাশের সেই অদ্ভুত ভারী ভাবটা কেটে গেছে। সামনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত বাঁধের রাস্তা, সাইকেলের হ্যান্ডেলে হারিকেন ঝুলিয়ে এক গ্রামবাসী মন্থর গতিতে পার হয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন হাঁপাতে হাঁপাতে নৌকাসহ তীরে ভিড়লাম, ঘড়ি দেখে স্তম্ভিত ও শিউরে উঠলাম। রাতের ১১টা বেজে গেছে! শ্মশানের সেই জায়গা থেকে বাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে গেছে, অথচ দূরত্ব ছিল মাত্র সামান্য কয়েক মিনিটের পথ।
সেই রাতের অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অব্যাখ্যাত এক রহস্য, যা আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।



