ব্রহ্মদৈত্য

আঁকা : অরবিন্দ হালদার
সাধারণত দীর্ঘদেহী এবং গৌরবর্ণের। চুল কম বা মাথায় টাক। বয়সে বৃদ্ধ। খালি গায়ে ধুতি এবং গলায় পৈতে। পায়ে থাকে কাঠের খড়ম, যার খট খট শব্দে গভীর রাতে তার উপস্থিতি বোঝা যায়। হাতে কখনো ছড়ি থাকে। আবার অনেকের হুঁকো খাওয়ার অভ্যাসও দেখা যায়। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারে এবং অবলীলায় বেদ বা উপনিষদের শ্লোক আওড়াতে পারে।
বর্ণনাটি ব্রহ্মদৈত্যর। বাঙালির লোকসংস্কৃতি এবং রূপকথার বিশাল ভাণ্ডারে ভূতের অভাব নেই। তবে শাঁখচুন্নি, পেত্নী, মামদো কিংবা মেছো ভূতের ভিড়ে ব্রহ্মদৈত্য নামের এক অতিপ্রাকৃত চরিত্র পাওয়া যায় যে, ভূতের জগতের আভিজাত্য বা ভদ্রলোক শ্রেণির প্রতিনিধি। লোককথায় এই ভূত যেমন ভয় জাগায়, তেমনি জাগায় কৌতূহল আর এক ধরনের অদ্ভুত নস্টালজিয়া।
এই ব্রহ্মদৈত্য বা বেম্মদত্যি বঙ্গসাহিত্যের ভূতসমাজে সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী। ব্রহ্মদৈত্য নামের মধ্যেই তার কুলের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো ব্রাহ্মণ যদি অপঘাতে মারা যান কিংবা অবিবাহিত অবস্থায় মৃত্যু হয় তবে তার আত্মা ব্রহ্মদৈত্যে পরিণত হয়। ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি এসেছে ব্রাহ্মণ থেকে, আর ‘দৈত্য’ মানে অতিপ্রাকৃত শক্তিধর সত্তা। সেই থেকেই নাম ব্রহ্মদৈত্য।
অন্যান্য ভূত যেখানে নোংরা বা অন্ধকার স্থানে থাকতে ভালোবাসে, ব্রহ্মদৈত্যের পছন্দ ঠিক তার উল্টো। সাধারণত কোনো প্রাচীন নির্জন বেলগাছ হলো এদের প্রধান আস্তানা। সনাতন ধর্মে বেলগাছ অত্যন্ত পবিত্র তাই ব্রহ্মদৈত্যের মতো সাত্ত্বিক ভূত এ গাছকেই তার উপযুক্ত আবাস হিসেবে বেছে নেয়। এ ছাড়া বড় বট বা অশ্বত্থগাছের ডালেও তাদের বসে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় ব্রহ্মদৈত্যরা পরিত্যক্ত পুরনো বাড়িতেও বাস করে।
বেশিরভাগ গল্পে ব্রহ্মদৈত্যদের উপকারী নীতিবান এবং পরোপকারী ভূত হিসেবেই দেখানো হয়ে থাকে। তারা দুস্থ, দুঃখী, সৎ ও অভাবী মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করে। অনেক রূপকথায় দেখা যায় কোনো দরিদ্র বা গরিব ব্রাহ্মণকে এরা গুপ্তধনের সন্ধান দিচ্ছে, কোনো সংকট অলৌকিক উপায়ে সমাধান করছে কিংবা কোনো মেধাবী ছাত্রকে আশীর্বাদ করছে।
তবে এদের অপকারী রূপও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়। কারণ, এরা প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী। কেউ যদি এদের বাসস্থানে নোংরা করে বা গাছ কাটার চেষ্টা করে তবে ব্রহ্মদৈত্য খুব রুষ্ট হয়। রেগে গেলে এরা মানুষের ঘাড় মটকে দিতে দ্বিধা করে না এবং তখন সে গোটা পরিবারের ক্ষতি করতে পারে।
বাংলা সাহিত্যে ও লোকগাঁথায় ব্রহ্মদৈত্যের উপস্থিতি বেশ পুরনো। ঠাকুমার ঝুলির গল্প থেকে শুরু করে গ্রামীণ পালাগান কিংবা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতেও লোকবিশ্বাসের এই ভূতের দেখা মেলে। লীলা মজুমদারের ‘সব ভুতুড়ে’ বইয়ের ‘চেতলায়’ গল্পে দেখা যায় বটু ও তার বন্ধুকে এক তালগাছ নিবাসী ব্রহ্মদৈত্য চিংড়ি মাছ ভাজা খাইয়েছিল এবং বটুর ছোট ঠাকুমাকে তালগাছের গুঁড়ির ভেতর এক বাক্স সম্পদের হদিস দিয়েছিল। আবার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘সেই সব ভূত’ গল্পে ঠাকুমার বাড়ির পেছনের বাগানের কোণের বেলগাছ খালি করে তার বাসিন্দা ব্রহ্মদৈত্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় ঠাকুমা ও মোনা ওঝার মন খারাপ হয়েছিল।
এদিকে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ ভূতের রাজার নৃত্যের দৃশ্যে ব্রহ্মদৈত্যের সেই স্বতন্ত্র আভিজাত্য দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে আধুনিক নগরায়ণ আর বিজ্ঞানের প্রভাবে এই প্রাচীন বিশ্বাসগুলো অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এখন আর গ্রামের পথে খড়মের শব্দ শোনার মতো নিস্তব্ধতা নেই আর সেই প্রাচীন বেলগাছগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও বাংলা সিনেমা, নাটক, কমিকস এবং ইউটিউবের ভূতের গল্পে আজও ব্রহ্মদৈত্য ফিরে আসে। বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক, শত শত বছর ধরে মানুষের গল্পে এবং রাতের অন্ধকারে দুলতে থাকা বটগাছের ছায়ায় ব্রহ্মদৈত্য আজও বেঁচে আছে।






