অশরীরী জগৎ
যক্ষ

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
লোকসংস্কৃতি আর পুরাণের জগতে যক্ষ এক রহস্যময় চরিত্র। তাকে ঘিরে আছে ধনসম্পদ, অরণ্য, উর্বরতা আর অদৃশ্য এক জগতের নানা গল্প। একসময় বাংলায় বিশ্বাস করা হতো, কৃপণ ব্যক্তিরা তাদের অঢেল ধনসম্পদ মাটির নিচে ঘর বানিয়ে লুকিয়ে রাখতেন। সেই গুপ্তধনের পাহারায় বসিয়ে দেওয়া হতো কোনো শিশুকে। খাবার ও পানির অভাবে একসময় শিশুটির মৃত্যু হলে সে যক্ষে পরিণত হতো। এরপর মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা সম্পদের পাহারা দিতে দিতে সে অপেক্ষা করত আসল মালিকের কাছে সেই ধন হস্তান্তরের জন্য। আবার বিশ্বাস ছিল, যোগ্য ভক্তদের যক্ষ ধনসম্পদ ও উর্বরতার আশীর্বাদও দিতে পারে।
পৌরাণিক ও লৌকিক বিশ্বাসে যক্ষকে তাই ধনসম্পদের অতিপ্রাকৃত রক্ষক হিসেবে দেখা হয়। তারা সাধারণত উপকারী, তবে কখনো ক্ষতিকরও হতে পারে। পানি, উর্বরতা, গাছ, অরণ্য, সম্পদ ও মরুভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ গ্রন্থে পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ও মধ্যযুগের মন্দিরেও যক্ষকে অভিভাবক দেবতা হিসেবে দেখা হয়েছে। যক্ষের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ যক্ষী বা যক্ষিণী।
হিন্দু, জৈন, খাসা মল্ল ও বৌদ্ধ গ্রন্থে তাদের দ্বৈত চরিত্রের উল্লেখ রয়েছে। একদিকে তারা বন ও পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত প্রকৃতির আত্মা, অন্যদিকে তাদের অন্ধকার রূপও আছে। সেই রূপে তারা প্রান্তর ও পথঘাটে ঘুরে বেড়ানো একধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তা, যারা রাক্ষসের মতো ভ্রমণকারীদের গ্রাস করতে পারে।
হিন্দু পুরাণে ধন ও সমৃদ্ধির দেবতা ‘কুবের’ হলেন যক্ষদের রাজা। তিনি উত্তর দিকের শাসক এবং জগতের সব ঐশ্বর্যের মালিক। কুবেরকে প্রায়ই বিশাল ভুঁড়ি ও মণি-পাত্র বহনকারী হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে, বৌদ্ধসাহিত্যে যক্ষরা বৈশ্রবণের অনুচর এবং ধার্মিকদের সুরক্ষাকারী দেবতা। জৈন ধর্মে যক্ষ ও যক্ষিণীদের ‘শসনদেবতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যারা তীর্থঙ্করদের সুরক্ষা দেন। পূর্ণ জ্ঞান অর্জনকারী এবং সংসার বা জন্ম-মৃত্যুর চক্র পার হয়ে অন্যকে মুক্তির পথ দেখানো আধ্যাত্মিক গুরু ও প্রবর্তকদের তীর্থঙ্কর বলা হয়।
ধনসম্পদের রক্ষক, প্রকৃতির অদৃশ্য প্রহরী কিংবা অজানা ভয়ের প্রতীক যক্ষ যেন দৃশ্যমান পৃথিবী আর রহস্যে ঢাকা এক অদৃশ্য জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রহরী।



