প্রাণ ও প্রকৃতি
অনাহূত অতিথি

আন্ধারমানিক থেকে ফেরার পথে চাইম্প্রা ঝিরিতে দেখা হয়েছিল ভালুকের সঙ্গে। সেই গল্প শুনিয়েছেন সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল
বান্দরবানের চাইম্প্রা ঝিরি
অন্ধকার রাত। মাইকোয়াপাড়ার খাড়া পাহাড় বেয়ে নামতেই চাইম্প্রা ঝিরি। মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো শীতে বিপজ্জনক এই ঝিরি পেরিয়ে যেতে হবে বোলাইপাড়ায়। সাপখোপ, জলজ পোকামাকড় তো আছেই; সেই সঙ্গে আছে বড়-ছোট নানা আকৃতির পিচ্ছিল পাথর। তবে চাইম্প্রা ঝিরিতে আরও বড় চমক অপেক্ষা করে আছে, সেটাই বা কে জানত?
বান্দরবানের গহিনে আন্ধারমানিক অভিযানের পুরো ট্রেইলটাই ভীষণ রোমাঞ্চকর আর বিপৎসংকুল। অভিযানের দ্বিতীয় দিনে আমরা মাইকোয়াপাড়া হয়ে পৌঁছে যাই নারিশ্যা ঝিরি। সকালের উজ্জ্বল আলোর মধ্যেও অন্ধকারাচ্ছন্ন নারিশ্যা ঝিরি যেন কোনো ভিনগ্রহের আঙিনা। অগভীর জলে ছপছপিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। দুপাশে খাড়া পাথুরে দেয়াল উঠে গেছে আকাশপানে। প্রাচীন সব গাছের পত্রপল্লব ভেদ করে নারিশ্যা ঝিরিতে আলো পৌঁছে না। কখনো দমকা বাতাসে গাছের পাতা সরে যায়, সেই ফোকড় দিয়ে নাট্যমঞ্চের স্পটলাইটের মতো সূর্যরশ্মি এসে পড়ে ঝিরির জলে। এ জন্যই নারিশ্যা ঝিরি হয়ে গেছে আন্ধারমানিক। ঝিরির এক প্রান্ত এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে সাঙ্গু নদীতে। মাঝে পাহাড় থেকে খসে পড়েছে বিশালকায় এক পাথর, বন্ধ হয়ে গেছে পথ। সেখান থেকেই ফিরতে হলো আমাদের। এবার ভিন্ন পথে আন্ধারমানিক পাড়া হয়ে সাঙ্গু নদীর কূল ঘেঁষে ফের মাইকোয়াপাড়া। সেখানে দুপুরের খাবার সারতে সারতে বেলা শেষ হয়ে যায়। লাল টুকটুকে সূর্য যখন অস্তাচলে যাচ্ছে, তারই কনে দেখা আলোয় আমরা নামতে শুরু করলাম মাইকোয়াপাড়ার পাহাড় থেকে।
ঝুপ করে নেমে এলো সন্ধ্যা। পাহাড়ের পাদদেশে নেমেই জ্বালাতে হলো হেডটর্চ। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দলনেত্রী বর্ষা শোনালেন সতর্কবাণী। সবাই সারি বেঁধে চলতে হবে, কোনো বন্যপ্রাণী দেখলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। ঝিরিতে নেমেই অবশ্য সাইদুর ভাই সতর্কবাণী ভুলে চিংড়ি ধরার মিশনে নেমে পড়লেন। মাছ শিকারে যোগ দিল আরও কয়েকজন। চারদিকে ঝিঁঝির ডাক, বন্যপ্রাণীর অচেনা আওয়াজ। কিছুটা এগোতেই ফের পাথরের বাধা। দুই পাশে গভীর জল। জায়গাটা পেরোতে মাঝখানের পর্বতপ্রমাণ পিচ্ছিল পাথর বেয়ে উঠতে বেশ কসরত করতে হলো। ঠিক তখনই সামনে থেকে চাপা কণ্ঠে এলো সতর্কবাণী— স্টপ! সবাই যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দে।
হেডটর্চের তীব্র আলোয় দেখা গেল কিছুদূরে ঝিরির পাশে পানি পান করছে একটি লোমশ কালো ভালুক! শীতের মধ্যেও ঘাম ছুটল শরীরে। আনন্দ পরিণত হলো আতঙ্কে! ভয় পেলে বা হুমকি মনে করলে অবশ্য আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে ভালুক। আর তার আক্রমণ বড় ভয়ংকর। বেঁচে ফিরলেও মুখের জিওগ্রাফি পাল্টে যাবে চিরতরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভালুকটি পানি পান করে নিঃশব্দে চলে গেল।
মানুষের লোভের থাবায় ধ্বংস হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল, ন্যাড়া হচ্ছে সবুজ পাহাড়, উজাড় হচ্ছে বন। সেই রাতে প্রকৃতির রাজ্যে আমরা ছিলাম অনাহূত অতিথি।




