বিশ্বকাপের নতুন শহর কানাডা

দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় থাকেন মুজাহিদুল ইসলাম আকাশ। ফুটবলপ্রেমী এই দন্ত চিকিৎসক কানাডায় বিশ্বকাপ, সেখানকার মানুষের ফুটবলে আগ্রহ এবং নিজের খেলা দেখার অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন পাঠকদের
একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দিয়ে গল্পটা শুরু করি। যে খেলাটাকে আমরা ফুটবল হিসেবে জানি, সেই খেলাটা কানাডাতে ফুটবল নামেই পরিচিত না। এখানে ফুটবল বলতে মানুষ বলছে অন্য আরেকটি খেলা। সেই খেলাতে আসলে পায়ের কোনো ব্যবহার নেই! আমেরিকার ফুটবলের মতোই কিন্তু আবার একেবারে আমেরিকান ফুটবলের হুবহু কপি নয়। আমরা যাকে ফুটবল বলি, কানাডার মানুষের কাছে সেটি সকার। এবং আরও মজার বিষয়, অনেক কানাডিয়ানই আসলে জানে না, সকার কীভাবে খেলতে হয়! অদ্ভুত না ব্যাপারটা! আর সে দেশেই হচ্ছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল!
এখানকার প্রধান খেলা হকি। সেটিও আমাদের হকির মতো নয়; আইস হকি। কানাডিয়ানদের রক্তে মিশে আছে এই খেলা। এই খেলায় হার-জিত মানে বিশাল ব্যাপার। জান-প্রাণ দিয়ে কানাডিয়ানরা এই খেলা খেলে। এজন্য বলা হয় এদের ডিএনএতে আইস হকি ছাড়া কিছু নেই!
কানাডিয়ানরা জানে, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ হচ্ছে। তারা বিষয়টি নিয়ে আনন্দিত; কিন্তু তার থেকে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাদের দেশে যে কয়টি খেলা হবে, তা যেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে হয় এবং কানাডায় খেলা দেখতে আসা প্রত্যেক মানুষ যেন পজিটিভ ইম্প্রেশন নিয়ে কানাডা থেকে চলে যান। এজন্যই একেবারে ঝকমকে গোছানো-সাজানো একটা ওয়ার্ল্ড কাপ কানাডায় হয়েছে। যেদিন যে শহরে খেলা, সেই শহরের ট্রাফিক দেখলে বোঝার উপায় নেই কোথাও এত বড় আয়োজন হচ্ছে। পুলিশ বহু আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে খেলা দেখতে যারা যাবে, তাদের যাওয়া-আসার রাস্তার ম্যাপ। স্টেডিয়ামে ঢোকা ও বের হওয়ার মুখে কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। যারা খেলা দেখতে এসেছে, বিভিন্ন শহর থেকে, বিভিন্ন দেশ থেকে, বিভিন্ন ভাষার এই মানুষগুলোকে পথনির্দেশ দেওয়ার জন্য গণপরিবহনগুলোর স্টেশনে বাড়তি লোক কাজ করছে। তাদের গায়ে বিশেষ পোশাক, যাতে সহজেই চিনতে পারা যায়।
একেবারে ঝকমকে গোছানো-সাজানো একটা ওয়ার্ল্ড কাপ কানাডায় হয়েছে
কানাডায় যে কয়টি খেলা হয়েছে, তার সবকটিতেই টিকিটের দাম মোটামুটি বাংলাদেশি টাকায় ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। ভিআইপিগুলো আরও বেশি দামের। কানাডিয়ানদের আয়-রোজগারের তুলনায় এগুলো যথেষ্ট এক্সপেনসিভ। কিন্তু বহু আগে খেলার টিকিট শেষ হয়ে গিয়েছে!
এই দুটো উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বোঝানো কানাডায় ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ আসলে কীভাবে নাড়া দিয়েছে।
এটি আপনি বাইরে থেকে বুঝতে পারবেন না। কারণ, কানাডিয়ানরা আবেগ প্রকাশ করে না। আপনি যদি কানাডিয়ান ফুটবল টিমের একটি ম্যাচও দেখে থাকেন, আপনি বুঝতে পারবেন কানাডিয়ানরা কীভাবে প্রস্তুতি নেয়। কোনো ম্যাচে খেলা শেষ হওয়ার এক মিনিট আগেও কানাডিয়ানরা পরাজয় মেনে নিয়ে বসে থাকেনি। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত তারা লড়াই করেছে।
এই যে ওয়ার্ল্ড কাপ, কানাডিয়ানদের ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েক দিন আগে এখানকার প্রধান একটি দৈনিক রিপোর্ট করেছে, এখানকার শিশু-কিশোররা এখন সকাল শব্দের পরিবর্তে ফুটবল ব্যবহার শুরু করছে! কেন করছে জানেন, ওদের মাথায় ফুটবল ঢুকে যাচ্ছে। একবার যদি মাথায় ঢুকে যায়, কানাডিয়ানরা তার ফল বের করে আনবেই।
এত বড় একটা ওয়ার্ল্ড কাপের সহ-আয়োজক দেশ কানাডা; কিন্তু বাড়িতে বাড়িতে আপনি পতাকা দেখতে পাবেন না, রঙ-বেরঙের পোস্টার কোথাও লাগানো নেই, যত্রতত্র বিলবোর্ড নেই, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বলে মারামারি নেই। তাই হঠাৎ করে দেখলে খটকা লাগে, এখানে আদৌ বিশ্বকাপ হচ্ছে?
কিন্তু আপনি স্টেডিয়ামে গেলে দেখবেন, খেলার দিনগুলোতে মানুষের পোশাক খেয়াল করলে লক্ষ করবেন— অনেকেই জার্সি পরে আছেন। অফিসে, স্কুলে, কফিশপে খেলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে টিভির সামনে ওরা বসে থাকছে না। আমার নিজের অফিসের কথাই বলি, সাদাকালো মিলিয়ে আমার ১০ জনের মতো স্টাফ আছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। একেকজন সাপোর্ট করে একেক দেশ, কিন্তু ওইটুকুই। টিভিতে খেলা চলছে। কাজের ফাঁকে এক-দুই মিনিট টিভির সামনে আসে, স্কোর দেখে; আবার কাজে চলে যায়।
কানাডিয়ানদের ভেতরে ফুটবল ঢুকে গেছে! এই খেলায় কানাডিয়ানরা ভালো করতে থাকবে
ওয়ার্ল্ড কাপ উপলক্ষে বেশ কিছু বড় শহরে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন আছে। এগুলো মূলত করেছে সিটি করপোরেশন বা মিউনিসিপালিটি। সাধারণত ছোট মাঠের মতো জায়গায় এই আয়োজনগুলো করা হয়েছে। যে যখন সময় পায়, সে যায়। তাই ওই সব জায়গায় খুব বেশি ভিড় হয় না। অনেকটা পিকনিক পিকনিক ভাব আছে।
সবচেয়ে মজার খেলা দেখার জায়গা হচ্ছে পাবগুলো। যেখানে চারপাশে অনেক বড় স্ক্রিনে খেলা চলে, আর মানুষজন বিয়ার-অ্যালকোহল-ওয়াইন নিয়ে আড্ডা দিতে দিতে খেলাগুলো দেখে।
এবার একটু আমার নিজের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা বলি। প্রায় তিন মাস আগে টিকিট কেটেছি। আমি চেয়েছিলাম তিনটি টিকিট, কিন্তু কাটতে পেরেছি মাত্র একটি। এতটাই চাহিদা ছিল। এবার ফিফা টিকিটের দাম করেছে আকাশচুম্বী। ক্যাটাগরি-১ একটি টিকিট ২ হাজার ডলার বা ২ লাখ টাকার কাছাকাছি। ভাবা যায়! তারপরও কানাডার ম্যাচগুলোতে টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে হু হু করে। কেউ কেউ ডাবল, তিন ডাবল দামেও পরে টিকিট কেটেছেন।
অন্য যেকোনো সময় এখানকার পত্রপত্রিকাগুলোতে ফুটবলের নিউজ থাকে খুব ছোট করে অথবা থাকেই না। খুব বড় ঘটনা না হলে ফ্রন্ট পেজে সাধারণত খেলার খবর আসে না। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে কানাডিয়ান পত্র-পত্রিকার চেহারা বদলে গেছে। বিশেষ করে কানাডার ম্যাচ যেদিন থাকে, সেদিন উত্তাপ টের পাওয়া যায় পত্র-পত্রিকা, টিভি সব নিউজেই। গত সপ্তাহে একটা নিউজ বের হলো, টরন্টোতে হোটেল প্রাইস বেড়ে গেছে দ্বিগুণ-তিন গুণ। কারণ, পর্তুগালের ম্যাচ পড়েছে টরন্টোতে। আমি নিজে স্টেডিয়ামে গিয়েছি। সেদিন ছিল কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচ। স্বাভাবিকভাবে অন্য ম্যাচের তুলনায় উত্তেজনা এবং আবেগ বেশি থাকা কথা। সেটি ছিলও। শহর জুড়ে সে আবহাওয়া টেরও পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এর জন্য আলাদা করে কোনো যানজট হয়নি। মাঠে খেলা হয়েছে একেবারে দর্শকের সামনে, সেখানে আলাদা করে কোনো বেড়া বা ফেন্স দেওয়া নেই। চাইলে লাফ দিয়ে মাঠে চলে যাওয়া যায়, কিন্তু কেউ যাচ্ছে না। স্টেডিয়ামে ঢুকে দেখলাম, চারপাশে সব বর্ণের মানুষ আছে। সাদা, কালো, আমাদের মতো বাদামি— সব ধরনের মানুষ। প্রথমে কানাডা গোল খেয়ে গেল, কয়েক মিনিটের জন্য একটু শান্ত পরিবেশ; তার পরে শুরু হলো উৎসাহ দেওয়া। পুরো গ্যালারি জেগে গেল। হাজার হাজার মানুষ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিচ্ছে। চলতেই থাকল যতক্ষণ গোল পরিশোধ করল। এটাই কানাডিয়ানদের বৈশিষ্ট্য লেগে থাকবে শেষ পর্যন্ত। এজন্যই এখানকার স্পোর্টস বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কানাডিয়ানদের ভেতরে ফুটবল ঢুকে গেছে! এই খেলায় কানাডিয়ানরা ভালো করতে থাকবে।
সবকিছু মিলিয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ তৈরি করেছে ভীষণ আনন্দময় এক পরিবেশ। বলা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিবাসী হয়ে আসা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষকে এই ওয়ার্ল্ড কাপ একটা সুতায় বেঁধে দিয়েছে।






