বাঘের ট্রেইল ধরে

বিকালের পড়ন্ত রোদে চকচক করছিল তার গায়ের সোনালি রঙ আর গাঢ় ডোরাকাটা দাগ, দুপাশের গাল থেকে ঝুলছিল লম্বা লোম। মিনিটবিশেক আমাদের দিকে স্থির তাকিয়ে থেকে বাঘটি ধীরেসুস্থে হেঁটে বনপ্রান্তরে মিলিয়ে গেল
দীর্ঘদিন ধরে বাঘ নিয়ে গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল খান। ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস সামনে রেখে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সুন্দরবন ও পাহাড়ি বনের বাঘের বর্তমান অবস্থা এবং সংরক্ষণের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি
আমার বাবার প্রথম চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান টাঙ্গাইল) মধুপুর গড়ের জলছত্র মিশনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই সেখানকার নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে একটি কুষ্ঠ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়, আর বাবা সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০-এর দশকে মধুপুর গড় ছিল গহিন ও আদিম এক অরণ্য। বাঙালি বসতি বলতে তখন সেখানে কিছুই ছিল না, শুধু সীমিত পরিসরে গারো সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের বসবাস ছিল। ঘন সেই শালবনে তখন বাঘ, ময়ূরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল। ১৯৫৬ সালের দিকে বাবা সেখানে কয়েকবার নিজের চোখে প্রকাণ্ড বাঘ দেখেছেন। বর্ষার দিনে ঘর থেকে বাইরে বের হতে গিয়ে ঘরের দরজা খুলেই সামনে বিশালাকার বাঘ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার মতো রোমাঞ্চকর ঘটনাও তার জীবনে ঘটেছে। আরেক রাতে গাড়িতে করে ফেরার পথে রাস্তার ঠিক মাঝখানে দুটি বাঘ একদম পথ ব্লক করে শান্ত ভঙ্গিতে বসে ছিল। বাবা শৌখিন শিকারিও ছিলেন। শৈশব থেকে বাবার মুখে শোনা বাঘ, ময়ূর আর বুনো জঙ্গলের রোমাঞ্চকর গল্পই মূলত প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি আমার ভেতরে এক অদম্য অনুরাগের জন্ম দেয়।
তবে আফসোস, আমার প্রজন্মে আসতে আসতে মধুপুর গড়ের সেই সমৃদ্ধ বন আর বাঘ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। মধুপুরের এ করুণ পরিণতি আমার মনে এক গভীর উপলব্ধি জন্ম নেয়, যেভাবে আমাদের বন ও বন্যপ্রাণী ধ্বংস হচ্ছে, যদি সময়মতো এদের সংরক্ষণে বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে একদিন সুন্দরবন থেকেও বাঘ চিরতরে মুছে যাবে। এই তাড়না থেকেই প্রাণিবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা। পরে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঘের প্রতিবেশ এবং সংরক্ষণ বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পাই।
হঠাৎ দেখা
পিএইচডির গবেষণা কাজের জন্য আমাকে দেড় বছর সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলে ফিল্ড ওয়ার্ক করতে হয়েছিল।
সুন্দরবনে বুনো বাঘের সঙ্গে সামনাসামনি সাক্ষাতের অপূর্ব মুহূর্তটি আসে ২০০১ সালে, পিএইচডির ফিল্ড ওয়ার্কের প্রথম সফরেই। দিনটি ছিল ২০০১ সালের ৯ আগস্ট। তিন সঙ্গীসহ লঞ্চ থেকে নেমে সুন্দরবনের কটকা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের জেটির পাশের এক খালের জঙ্গলের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। এমন সময় জঙ্গল থেকে গম্ভীর ও গমগমে আওয়াজে ভেসে এলো, ‘হাউউউ, হাউউউ’। জীবনে প্রথমবার বুনো বাঘের ডাক শুনলাম! গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। কিন্তু আমাদের চমকে দিয়ে খুব কাছ থেকেই আরেকটি বাঘের হাঁক ভেসে এলো। বনের ভেতরে একটি নয়, দুটি বাঘ এত কাছাকাছি থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। আমাদের সঙ্গে ছিলেন সুন্দরবন যার নখদর্পণে, সেই ষাটোর্ধ্ব আকতারুজ্জামান কামাল অর্থাৎ ‘বাঘমামা’। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা দ্রুত পিছিয়ে এসে মূল জেটি ও টাওয়ারের দিকে চলে এলাম। সুন্দরবনে আসার পথে মোংলা বাজার থেকে একটি মাটির হাঁড়ি কিনে এনেছিলাম। এবার টাওয়ার খুব সাবধানে যেদিক থেকে বাঘের ডাক আসছিল, সেদিকে একটি বুনো বরই ঝোপের নিচে লুকিয়ে মাটির হাঁড়ির ভেতর মুখ দিয়ে বাঘের ডাক নকল করতে লাগলাম। যেন বনের সীমানায় অন্য কোনো মদ্দা বাঘ ঢুকে পড়েছে ভেবে সে এগিয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সবুজ কার্পেটের মতো বিছানো ঘাসের মাঠে ভেসে উঠল এক প্রকাণ্ড মাথা! ওটাই সেই মদ্দা বাঘ, যা বাঘিনীকে ডাকছিল। বিকালের পড়ন্ত রোদে চকচক করছিল তার গায়ের সোনালি রঙ আর গাঢ় ডোরাকাটা দাগ, দুপাশের গাল থেকে ঝুলছিল লম্বা লোম। মিনিটবিশেক আমাদের দিকে স্থির তাকিয়ে থেকে বাঘটি ধীরেসুস্থে হেঁটে বনপ্রান্তরে মিলিয়ে গেল। সে বছরই ১৮ অক্টোবর দ্বিতীয়বার সুন্দরবনে বাঘ দেখি। পরে গবেষণা ও মনিটরিংয়ের প্রয়োজনে সুন্দরবনে মোট ১৮ বার বাঘ দেখার বিরল সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
অন্য দেশে বাঘের বনে
২০০৯ সালে লন্ডনের জুওলজিক্যাল সোসাইটির (ZSL) সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইন্দোনেশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে সুমাত্রার প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘ সংরক্ষণের এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করি। ৯ থেকে ১৯ মার্চ— এই ১১ দিনের সুমাত্রা অভিযানটি ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জিং। আমার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাজ্যের দুই গবেষক ও ইন্দোনেশিয়ার একদল নিবেদিতপ্রাণ বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী। মূলত সেখানে বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং একটি নির্দিষ্ট নরখাদক বাঘ ধরে পুনর্বাসন করাকে কেন্দ্র করে কাজটি পরিচালিত হচ্ছিল। মূল ‘বারবেক জাতীয় উদ্যান’ ছাড়াও আশপাশের খণ্ড খণ্ড বন এবং অয়েল পাম ও রাবারবাগানে বাঘের অবাধ আনাগোনা ছিল। সুন্দরবনে বাঘ-মানুষ সংঘাত নিয়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় আন্তর্জাতিক ওই দলের হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছিলাম। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন বাঘের বনেও কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে।
ভারতের অনেক ব্যাঘ্র প্রকল্প সুন্দরবনের তুলনায় বেশ ছোট। তাই দীর্ঘমেয়াদে বাঘ টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সুন্দরবনের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন এক অনন্য দুর্গ।
চোরাশিকারি ও উদ্ধারকর্মী
সুন্দরবনে বাঘের আবাস্থল বা হ্যাবিটেটের তেমন বড় সংকট নেই। ক্লাইমেট চেঞ্জের ধীরগতির প্রভাব থাকলেও তা বাঘের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি নয়।
সুন্দরবনে বাঘের প্রধান সমস্যা চোরাশিকার। বাঘ নিজে এবং তার প্রধান শিকার প্রাণী চিত্রা হরিণ, উভয়ই চোরাশিকারিদের ফাঁদের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি সুন্দরবন থেকে উদ্ধার করে সুস্থ করার পর যে বাঘটিকে আবার বনে অবমুক্ত করা হলো, সেটি হরিণের শিকারি ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা, যেখানে বন বা লোকালয় থেকে উদ্ধার হওয়া কোনো আহত বাঘকে দীর্ঘ ছয় মাস পর প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। যেদিন বাঘটিকে সুন্দরবনের ‘আন্ধারমানিক’ অভয়ারণ্যে ছাড়া হয়, আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সড়কপথে মোংলা এনে সেখান থেকে লঞ্চে করে তাকে আন্ধারমানিকে নেওয়া হয়েছিল। অ্যানেসথেসিয়ার রেশ পুরোপুরি না কাটায় খাঁচা খুলে দেওয়ার পরও বাঘটি প্রথমে পানিতে নামতে চাচ্ছিল না। বাঘের অ্যানেসথেসিয়া থাকা অবস্থায় মাটিতে নামালে লাফ দিয়ে লঞ্চে উঠে আসার বা আক্রমণ করার ভয় থাকে, তাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সুন্দরবনেও অবমুক্তির সময় বাঘকে পানিতেই নামানো হয়। অবশেষে দুপুর ১টার দিকে লঞ্চটি পাড় ঘেঁষে ঠেকানোর পর বাঘটি এক বিশাল লাফে পাড়ে গিয়ে নামে। নামার পর তার হাঁটাচলায় অ্যানেসথেসিয়ার সামান্য প্রভাব বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু বনের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার ৩ ঘণ্টা পর আমাদের একটি বিশেষ ট্র্যাকিং টিম তার পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে, বাঘটির শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বন বিভাগের এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়।
সংরক্ষণ বিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো, ‘সব ডিম কখনো এক ঝুড়িতে থাকতে নেই।’ ধরুন, সুন্দরবনে যদি কখনো বড় কোনো মহামারী, সাইক্লোন বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তবে দেশের পুরো বাঘ প্রজাতি একযোগে হুমকির মুখে পড়বে। তাই বাঘের জন্য একটি বিকল্প আবাস্থল বা ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সেকেন্ড হোম
অনেকে মনে করেন, সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশে হয়তো আর বাঘের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের কাসালং রিজার্ভ ফরেস্ট এবং সাঙ্গু ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে বাঘের টিকে থাকার বা পুনর্বাসনের চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা গবেষকরা সরাসরি না দেখলেও স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা, বোম বা ম্রোদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাঘের নির্ভরযোগ্য খবর পেয়েছি।
সুন্দরবনের চেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষণে একটা সুবিধা আছে। সেখানে বাঘের খাদ্য বা শিকার প্রাণীর বৈচিত্র্য অনেক বেশি। সাম্বার, মায়াহরিণ, বুনো শূকরসহ লার্জ প্রে অ্যানিমেল মোটামুটি ভালো সংখ্যায় রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীকে পুনরুজ্জীবিত বা ‘রি-ইন্ট্রোডিউস’ করার অনেক উদাহরণ আছে। যেমন কাজাখস্তানে প্রথমে বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার করে, পরে হরিণ ফিরিয়ে আনে এবং এখন বাঘ পুনর্বাসনের কাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও আমাদের একই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেখানকার নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে বন বিভাগের তদারকি কম থাকায় গত ১০-১৫ বছরে সেখানকার বন্যপ্রাণীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে।
বাঘ সংরক্ষণে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নিয়মিত নির্দিষ্ট সময় পরপর বিজ্ঞানসম্মত নিয়মে বাঘ গণনা বা ‘টাইগার পপুলেশন সেন্সাস’ চালানো। পর্যবেক্ষণে না রাখলে বাঘের সঠিক সংখ্যা ও সংখ্যা বৃদ্ধির গতিপথ বোঝা সম্ভব নয়। চোরাশিকার কঠোর হাতে দমন করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে নিরাপত্তা ও বন বিভাগের তদারকি বাড়ানো এবং সুন্দরবনের পাশাপাশি বিকল্প আবাস্থল নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে বাঘের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত করা সম্ভব।







