একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্র
বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ: পাঠ পদ্ধতি, শেষ পর্ব

সংগৃহীত ছবি
শিক্ষার্থী বন্ধুরা, এর আগের পর্বে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশের বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্বে কাব্যাংশের ছন্দ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। যা পাঠ্যতালিকার অন্যান্য কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণেও তোমাদের কাজে আসবে এবং তোমরা চাইলে ছন্দের মাধ্যমে নিজেরাও কবিতা লেখার প্রয়াস চালাতে পারবে।
সাহিত্যের সাধারণত দুটো অংশ থাকে— বিষয় ও আঙ্গিক। সাহিত্য কী নিয়ে লেখা, তা-ই সাহিত্যের বিষয়। মানুষের জীবন-সংশ্লিষ্ট প্রেম, ভালোবাসা, রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন প্রভৃতি হলো সাহিত্যের বিষয়। আর এই বিষয়াদি যেভাবে সাজানো হয়, তা-ই সাহিত্যের আঙ্গিক বা শিল্পরীতি। আঙ্গিক বা প্রকাশভঙ্গির কারণেই সাহিত্যিকগণ স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকেন।
কবিতার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে ছন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণত স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবিতা লেখা হয়। আবার গদ্যছন্দেও লিখিত হয়েছে অগণিত কবিতা। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রয়েছে আবার নানান ভাগ। যেমন— পয়ার, অমিত্রাক্ষর, চতুর্দশপদী। ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশটি রচিত হয়েছে অমিত্রাক্ষর ছন্দে। অমিত্রাক্ষর ছন্দে পরপর দুটো পঙ্ক্তির শেষ শব্দের মধ্যে মিল থাকে না বলেই এর নাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ।
ছন্দ বুঝতে হলে প্রথমেই অক্ষর বা দল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে এবং বুঝতে হবে মাত্রা গণনা ও পর্ব বিভাজন পদ্ধতি।
নিঃশ্বাসের স্বল্পতম প্রয়াসে উচ্চারিত ধ্বনিকে বলে অক্ষর। ইংরেজিতে আমরা যাকে সিলেবল বলি, বাংলায় তা-ই অক্ষর। অক্ষর প্রধানত দুই প্রকার— মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর। যে অক্ষর উচ্চারণের সময় শেষে স্বরধ্বনি পাওয়া যায়, তাকে মুক্তাক্ষর বলে। যেমন— আ, বা, নে, বি, ভী, মে প্রভৃতি। বদ্ধাক্ষর উচ্চারণের শেষে স্বরধ্বনি নেই, থেমে যেতে হয়। যেমন— আম, রাম, ষণ, নাদ, দম প্রভৃতি।
একই শব্দে থাকতে পারে শুধু একটি বা একাধিক অক্ষর। যেমন— ‘রাম’ শব্দটি একাক্ষরবিশিষ্ট শব্দ, এটি বদ্ধাক্ষর। আবার ‘বিভীষণ’ শব্দে রয়েছে তিনটি অক্ষর— বি, ভী, ষণ। এখানে বি, ভী মুক্তাক্ষর এবং ষণ বদ্ধাক্ষর।
সকল ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাত্রা। বদ্ধাক্ষরের মাত্রার ছন্দভেদে তারতম্য হয়। বদ্ধাক্ষর স্বরবৃত্ত ছন্দে এক মাত্রা, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে দুই মাত্রা। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে শব্দের শুরুতে ও মাঝে বদ্ধাক্ষর এক মাত্রা, শব্দের শেষে দুই মাত্রা আর স্বতন্ত্র বদ্ধাক্ষর সবসময় দুই মাত্রা।
একটি কবিতার পঙ্ক্তিকে সহজ ও সুন্দরভাবে পাঠ করার জন্য যে কয়টা অংশে ভাগ করা হয় তাকে পর্ব বলে। ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশের প্রতিটি পঙ্ক্তি দুই পর্ব বা ভাগে বিভাজিত। প্রথম পর্বে রয়েছে আট মাত্রা এবং দ্বিতীয় পর্বে ছয় মাত্রা। যেমন—
‘রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!’
এখানে প্রথম পঙ্ক্তির প্রথম পর্ব— ‘রাঘবের দাস তুমি?’
এখানে রা, ঘ, তু, মি চারটি মুক্তাক্ষর চার মাত্রা। বের, দাস বদ্ধাক্ষর। শব্দের শেষের বদ্ধাক্ষর ‘বের’ দুই মাত্রা এবং স্বতন্ত্র বদ্ধাক্ষর ‘দাস’ দুই মাত্রা। সর্বমোট প্রথম পর্ব আট মাত্রা। দ্বিতীয় পর্ব— ‘কেমনে ও মুখে’। এখানে কে, ম, নে, ও, মু, খে ছয়টি মুক্তাক্ষর ছয় মাত্রা। এভাবে সম্পূর্ণ কাব্যটির শুরুর পর্ব আট মাত্রা এবং শেষ পর্ব ছয় মাত্রায় বিন্যস্ত হয়ে রচিত হয়েছে।
শিক্ষার্থী বন্ধুরা, শুরুর দিকে ছন্দনির্ণয় ও পর্ব বিভাজন তোমাদের কাছে জটিল মনে হতে পারে। তবে তোমরা যদি শিক্ষক ও বইয়ের সহায়তায় ছন্দ আয়ত্তে আনতে পারো, তাহলে বিষয়টি মোটেই দুর্বোধ্য মনে হবে না। যেহেতু তোমাদের মাধ্যমেই আগামী দিনের বাংলা সাহিত্য-সংগীত সমৃদ্ধ হবে, তাই ছন্দ সম্পর্কে জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা, সরকারি সা’দত কলেজ, করটিয়া, টাঙ্গাইল।



