রক্তে যখন ফসফেট কমে যায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফসফেট শরীরের হাড় ও দাঁতের গঠন পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্রম এবং শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ উপাদান হলো ফসফেট। এটি হাড় ও দাঁতের গঠন, পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শরীরে শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে কোষের শক্তির প্রধান উৎস ATP তৈরিতে ফসফেট অপরিহার্য।
প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তে ফসফেটের স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত ২.৫ থেকে ৪.৫ mg/dL। রক্তে ফসফেটের মাত্রা ২.৫ mg/dL-এর নিচে নেমে গেলে তাকে হাইপোফসফেটেমিয়া বলে।
হাইপোফসফেটেমিয়া কেন হয়?
শরীরে ফসফেটের ঘাটতি প্রধানত তিনটি কারণে হতে পারে— খাদ্য বা অন্ত্র থেকে পর্যাপ্ত ফসফেট শোষিত না হওয়া, কিডনির মাধ্যমে অতিরিক্ত ফসফেট বেরিয়ে যাওয়া অথবা রক্ত থেকে ফসফেট শরীরের কোষের ভেতরে চলে যাওয়া। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হলো— দীর্ঘদিন অপুষ্টি বা অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ও অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন অপুষ্টির পর হঠাৎ পুষ্টি সরবরাহ। এছাড়া, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, কিছু হরমোনজনিত সমস্যা, বিশেষ করে হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম, দীর্ঘদিন অ্যালুমিনিয়ামযুক্ত অ্যান্টাসিড বা ফসফেট-বাইন্ডিং ওষুধ গ্রহণ ও কিছু কিডনির রোগ এবং নির্দিষ্ট মূত্রবর্ধক ওষুধের ব্যবহারেও এ রোগ হতে পারে।
এর লক্ষণ কী কী?
হালকা হাইপোফসফেটেমিয়ায় অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে ফসফেটের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—
- তীব্র পেশি দুর্বলতা ও পেশিতে ব্যথা
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া
- হাড়ের ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদে হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও শ্বাসকষ্ট
- শিশুদের ক্ষেত্রে হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ও রিকেটস
- অত্যন্ত গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া
হাইপোফসফেটেমিয়া কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ফসফেটের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। পাশাপাশি রোগের কারণ শনাক্ত করতে প্রয়োজনে রক্তে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-ডি, প্যারাথাইরয়েড হরমোন (PTH), কিডনির কার্যকারিতা এবং প্রস্রাবে ফসফেট নির্গমনের পরীক্ষা করা হয়।
প্রতিকার ও চিকিৎসায় করণীয়
হাইপোফসফেটেমিয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে ফসফেটের ঘাটতির মাত্রা, রোগীর উপসর্গ এবং অন্তর্নিহিত কারণের ওপর।
- ভিটামিন ডি-এর অভাব, কিডনির সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, অপুষ্টি কিংবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে তা শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে।
- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, দই, ডাল, বাদাম ও বিভিন্ন শস্যজাতীয় খাবারে ফসফরাস পাওয়া যায়। সুষম খাদ্যাভ্যাস শরীরে ফসফেটের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। তবে কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে খাদ্য নির্বাচন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।
- ভিটামিন ডি-এর অভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করতে হবে।
- প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ওরাল ফসফেট সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। তবে এটি নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়।
- গুরুতর হাইপোফসফেটেমিয়া বা রক্তে ফসফেটের মাত্রা অত্যন্ত কমে গেলে শিরায় ফসফেট দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রক্তের ইলেকট্রোলাইট, কিডনির কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমএসসিপি (আমেরিকা), সহকারী অধ্যাপক, কিডনি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।



