ফুসফুসের রোগ, লক্ষণ ও সুস্থতায় করণীয়

সংগৃহীত ছবি
একবার গভীরভাবে শ্বাস নিন। খুব সাধারণ একটি কাজ কিন্তু এই স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের আড়ালেই চলছে আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলোর একটি। জন্মের পর প্রথম কান্নার সঙ্গে শুরু হয় যে শ্বাস, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তা আমাদের সঙ্গী। আমরা ঘুমিয়ে থাকি, বিশ্রাম নিই, কাজ করি কিংবা ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলি, ফুসফুস কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। প্রতিটি মুহূর্তে ফুসফুস শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দিচ্ছে। অথচ শরীরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির যত্ন নেওয়ার কথা আমরা অনেক সময় ভুলেই যাই। এই নীরব কর্মীটির কথা আমরা মনে করি বেশিরভাগ সময় তখনই, যখন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফুসফুসের সুস্থতার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে কাজ করা, চলাফেরা করা, ঘুমানো এবং দৈনন্দিন জীবন উপভোগ করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ফুসফুসের অসুখ শুধু ধূমপায়ীদের নয়
ফুসফুসের রোগ বলতেই অনেকের মনে প্রথমে আসে ধূমপানের কথা। ধূমপান অবশ্যই ফুসফুসের জন্য প্রধান ঝুঁকি। কিন্তু ফুসফুসের অসুখের পরিধি অনেক বিস্তৃত। হাঁপানি/অ্যাজমা, এলার্জিক রাইনাইটিস, সিওপিডি, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস, ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, পালমোনারি ফাইব্রোসিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং ফুসফুসের ক্যান্সার সবই গুরুত্বপূর্ণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যেগুলো বিশ্বব্যাপী ফুসফুসজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর বড় কারণ।
অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করুন
হাঁপানি বা অ্যাজমা শ্বাসনালির বংশগত, এলার্জি ও প্রদাহজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগ। বারবার শ্বাসকষ্ট, বুক চাপ লাগা, শ্বাসের সঙ্গে শোঁ শোঁ শব্দ এবং দীর্ঘ মেয়াদী কাশি এর সাধারণ লক্ষণ। রাতে বা ভোরে অথবা ঋতু পরিবর্তন, ধুলাবালি, ধোঁয়া, পরাগরেণু, ঠান্ডা বাতাস, এলার্জি জনিত খাবার বা বস্তুর সংস্পর্শ কিংবা কিছু সংক্রমণ অনেকের ক্ষেত্রে উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।
সিওপিডি ফুসফুসের রোগ
ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা COPD একটি দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ। ধূমপান এর প্রধান কারণ; তবে বায়ুদূষণ, ঘরের ধোঁয়া এবং কর্মক্ষেত্রে ধুলা, ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট, শোঁ শোঁ শব্দ এবং সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। ধূমপান বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, টিকা ও পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউমোনিয়াকে অবহেলা নয়
নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের সংক্রমণ। নিউমোনিয়া হলে জ্বর, কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া গুরুতর হতে পারে। তাই তীব্র শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘস্থায়ী কাশিকে গুরুত্ব দিন
বাংলাদেশে যক্ষ্মা এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কফ, বুকব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর, রাতে ঘাম হওয়া কিংবা কফের সঙ্গে রক্ত আসা যক্ষ্মার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) -এর মতে, যক্ষ্মা প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য; তবে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘদিনের কাশিকে ‘সাধারণ সর্দি-কাশি’ ভেবে ফেলে রাখা উচিত নয়।
ব্রঙ্কিয়েকটেসিস
ব্রঙ্কিয়েকটেসিসে শ্বাসনালির স্থায়ী পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিনের কাশি ও প্রচুর কফ হতে পারে।অনেক রোগীর বারবার বুকের সংক্রমণ হয় এবং কখনো কফের সঙ্গে রক্তও আসতে পারে। এ রোগে শুধু সংক্রমণের সময় চিকিৎসা করাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শ্বাসনালির কফ পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা, প্রয়োজন অনুযায়ী পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন এবং নিয়মিত ফলোআপ গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ
ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজে ফুসফুসের সূক্ষ্ম টিস্যুতে প্রদাহ বা ক্ষতি হয়। দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি, পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। দ্রুত রোগ নির্ণয়, নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ এবং ধুলা-ধোঁয়া থেকে সুরক্ষা জরুরি।
স্লিপ অ্যাপনিয়া- নীরব ঘাতক
স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়; জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস এবং দিনে অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে CPAP ব্যবহার করে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ফুসফুসের ক্যানসার
ফুসফুসের ক্যানসারে দীর্ঘস্থায়ী বা পরিবর্তিত কাশি, কফে রক্ত, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও অকারণে ওজন কমে যেতে পারে। ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা, ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে স্ক্রিনিং/পরীক্ষা এবং সন্দেহজনক উপসর্গে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব লক্ষণ ‘সাধারণ’ ভেবে ভুল করবেন না
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্টকে অনেক সময় আবহাওয়া, বয়স কিংবা ‘সামান্য ঠান্ডা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। বিশেষ করে—
• দীর্ঘদিন ধরে হাঁচি-কাশি বা সর্দি থাকা
• দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত কফ হওয়া
• সামান্য হাঁটাচলাতেই শ্বাসকষ্ট হওয়া
• শ্বাসের সঙ্গে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া
• বারবার নিউমোনিয়া বা বুকের সংক্রমণ হওয়া
• শ্বাসের সাথে বুকে তীব্র ব্যথা
• কফের সঙ্গে রক্ত আসা
• অকারণে ওজন কমে যাওয়া
• দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীর কাশি বা শ্বাসকষ্টের ধরন পরিবর্তিত হওয়া
• রাতে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দিনে অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকা
এসব লক্ষণ দেখা দিলে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিভাবে যত্ন নিবেন
ফুসফুসের যত্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা। সিগারেট, বিড়ি ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের পাশাপাশি ভেপিং থেকেও দূরে থাকা জরুরি। শুধু সক্রিয় ধূমপান নয়, পরোক্ষ ধূমপানও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর। তামাকের ধোঁয়া হাঁপানি, সিওপিডি, ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও ধূমপানের ধোঁয়া থেকে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
ফুসফুসের শত্রু শুধু সিগারেট নয়। বায়ুদূষণ, ঘরের ধোঁয়া এবং কর্মক্ষেত্রে ধুলা, ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শও দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে।
যারা ধুলা-ধোঁয়ার পরিবেশে কাজ করেন, তাদের যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিশেষ করে মাস্ক পরিধান জরুরি। ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া বায়ু দূষণ রোধে দরকার সরকারি উদ্যোগ এবং পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের যথাযথ ভূমিকা।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ফুসফুসের পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্র ও পুরো শরীরের কর্মক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করে। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্যান্য উপযুক্ত ব্যায়াম করা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো। সিওপিডিসহ কিছু রোগে পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের ভূমিকা অপরিসীম।
ফুসফুসকে সুস্থ রাখার জন্য কোনো ‘ম্যাজিক বা যাদুকরী” খাবার নেই। বরং সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, বিশেষত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন - দুধ, ডিম, মাছ, মাংসের পাশাপাশি ভিটামিন সমৃদ্ধ সতেজ সবজি ফলমূল, পর্যাপ্ত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড—এই সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ভিটামিন-ডি এর ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর সংস্পর্শও বেশ জরুরি।
বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া এবং প্রযোজ্য অন্যান্য টিকা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগীদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কখন পরীক্ষা করাবেন?
দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট থাকলে রোগের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজন হলে বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, স্পাইরোমেট্রি বা পালমোনারি ফাংশন টেস্ট, রক্ত পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা মোটেই উচিত নয়।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (রেসপিরেটরী মেডিসিন, এনআইডিসিএইচ)
সহকারী অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল , ঢাকা
বক্ষব্যাধি, স্লিপ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ



