বিশ্ব ওআরএস দিবস
জীবন বাঁচানোর এক জাদুকরী পানীয়

মডেল: তানিয়া। ছবি: সামিয়া পারভীন
২৯ জুলাই। বিশ্ব ওআরএস দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে, যা দেখতে খুব সাধারণ হলেও মানুষের জীবন বাঁচাতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস তেমনই একটি আবিষ্কার। পানি, গ্লুকোজ এবং প্রয়োজনীয় খনিজ লবণের সঠিক মিশ্রণে তৈরি এই দ্রবণ গত কয়েক দশকে বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
একসময় ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা ছিল শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ষাটের দশকের শেষভাগে ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি বা ওআরটি আবিষ্কার হয়। তখন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের স্যালাইনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আইভি বা শিরায় স্যালাইন নিতে হতো। কিন্তু সব জায়গায় হাসপাতাল বা প্রশিক্ষিত মানুষ ছিল না। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, পানির সঙ্গে গ্লুকোজ ও সোডিয়ামের নির্দিষ্ট মিশ্রণ অন্ত্রের মাধ্যমে শরীর দ্রুত শোষণ করতে পারে। পানির সঙ্গে গ্লুকোজ ও লবণের এই চমৎকার সমন্বয় শরীরে পানিশূন্যতা দ্রুত দূর করে। ১৯৭৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম ওআরএসের ফর্মুলা তৈরি করে। ২০০৪ সালে এটি আরও উন্নত করা হয়, যাতে বমি কম হয় এবং দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়।
ওআরএসের উপাদান ও কার্যকারিতা
ওআরএস মূলত পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড, সাইট্রেট ও গ্লুকোজের একটি নিখুঁত মিশ্রণ। এর কাজ করার পদ্ধতিটি খুবই সহজ। স্যালাইনে থাকা গ্লুকোজ অন্ত্রের ভেতরে সোডিয়ামের সঙ্গে মিলে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরীরকে পানি শোষণে সাহায্য করে। এমনকি তীব্র ডায়রিয়ার সময়ও এই প্রক্রিয়া সচল থাকে। তাই সাধারণ পানি বা ফলের রস এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে না, যা কেবল ওআরএসই করতে পারে।
ওআরএস কীভাবে কাজ করে
ওআরএস হলো পরিষ্কার পানির সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড ও সাইট্রেটের মিশ্রণ।
• এর প্রতিটি উপাদানের নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে।
• গ্লুকোজ অন্ত্রে সোডিয়াম ও পানি শোষণে সাহায্য করে।
• সোডিয়াম ডায়রিয়ায় হারিয়ে যাওয়া প্রধান খনিজ লবণ পূরণ করে।
• পটাশিয়াম শরীরের ঘাটতি পূরণ করে।
• ক্লোরাইড শরীরের খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখে।
• সাইট্রেট শরীরের অম্লতা কমাতে সাহায্য করে।
কার ওআরএস প্রয়োজন?
ডিহাইড্রেশন বা শরীর থেকে পানি কমে যাওয়ার সমস্যা যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ছোটদের শরীরের আকার ছোট হওয়ায় সামান্য তরল কমে গেলেই তা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিরাও এর শিকার হতে পারেন সহজে। তীব্র গরম, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ফুড পয়জনিংয়ের কারণেও শরীর শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
কীভাবে ঘরে বসে ওআরএস প্রস্তুত করবেন?
• ওআরএস ব্যবহারের আগে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন
• একটি পুরো স্যাশে প্যাকেটে লেখা নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে গুলতে হবে
• অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা অন্য কিছু মেশানো যাবে না
• শিশুর জন্য সম্ভব হলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি ব্যবহার করতে হবে
• তৈরি করা ওআরএস ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার শেষ করতে হবে
কতটুকু ওআরএস খাওয়াবেন
দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ৫০ থেকে ১০০ মিলিলিটার করে খাওয়াবেন। ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ১০০ থেকে ২০০ মিলিলিটার। বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার খাওয়ানো যায়।
বমি হলে একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো ভালো।
কখন হাসপাতালে যাবেন?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে ওআরএস খাওয়ালে বাড়িতেই সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে সমস্যা যদি না কমে এবং নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত—
• যদি রোগীর পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়
• রোগী খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন
• খুব বেশি জ্বর থাকে
• ছয় ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব না হয়
• টানা বমির কারণে স্যালাইন মুখে নিতে না পারে
• রোগী অচেতন হয়ে পড়ে
• ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে
ওআরএস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, শুধু পানি খেলেই হবে। বাস্তবে তা নয়। কারণ, সাধারণ পানিতে প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ থাকে না।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, ডাবের পানি বা স্পোর্টস ড্রিংক ওআরএসের সমান। এটিও ঠিক নয়। এসব পানীয় শরীরকে কিছুটা তরল দিলেও ওআরএসের নির্দিষ্ট উপাদান ও অনুপাত এতে থাকে না।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, ওআরএস শুধু শিশুদের জন্য। আসলে শিশু থেকে বয়স্ক— সব বয়সের মানুষই প্রয়োজনে ওআরএস খেতে পারেন।




