ওষুধে কাজ না হলে আইভিএফ ভরসা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম দম্পতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো আইভিএফ। লিখেছেন ডা. উম্মে তাহমিনা সীমা
আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতিতে নারীর ডিম্বাশয় থেকে পরিপক্ব ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে পুরুষের শুক্রাণু সংগ্রহ করে বিশেষ ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটানো হয়। এ মিলনের ফলে যে ভ্রূণ তৈরি হয়, সেটিই পরে নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
কখন আইভিএফ প্রয়োজন?
নারীর জরায়ুর দুই পাশের ফ্যালোপিয়ান টিউব যদি পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তবে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে আইভিএফ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সন্তান ধারণ সম্ভব নয়।
যদি পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা বা কাউন্ট একদমই না থাকে কিংবা শুক্রাণুর সংখ্যা অনেক কম এবং নড়াচড়ার ক্ষমতা খুবই খারাপ থাকে, সেক্ষেত্রে আইভিএফ এবং প্রয়োজনে আরও উন্নত ‘ইকসি’(ICSI) পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস হলে ডিম্বাণু তৈরি হতে সমস্যা হয় অথবা ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন হলেও ভ্রূণটি জরায়ুতে ঠিকমতো বসতে পারে না। ওষুধ বা আইইউআই পদ্ধতিতে সফলতা না এলে তখন আইভিএফ করা হয়।
নারীর ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর রিজার্ভ বা সংখ্যা কমে গেলে আইভিএফের দরকার হয়।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা এবং আইইউআই পদ্ধতি ব্যর্থ হলে আইভিএফ করা হয়।
যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সব রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সন্তান হচ্ছে না এবং সবরকম প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যর্থ হচ্ছে, তখন আইভিএফ পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়।
যেভাবে করা হয় আইভিএফ
প্রথম ধাপ— ওভারিয়ান স্টিমুলেশন ধাপে নারীর ডিম্বাশয়ে বিশেষ কিছু ওষুধের মাধ্যমে উদ্দীপনা তৈরি করা হয়, যাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং উন্নতমানের ডিম্বাণু তৈরি ও বড় হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ— ডিম্বাণুগুলো যখন নির্দিষ্ট আকারে পৌঁছায় এবং পরিপক্ব হয়, তখন একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় নারীর শরীর থেকে ডিম্বাণুগুলো সংগ্রহ করা হয়।
তৃতীয় ধাপ— ডিম্বাণু সংগ্রহের দিনই স্বামীর কাছ থেকে বীর্য সংগ্রহ করা হয় এবং তা থেকে ল্যাবে ভালোমানের শুক্রাণু আলাদা করা হয়। এরপর ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংগৃহীত ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটানো হয়।
চতুর্থ ধাপ— ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের ফলে যে ভ্রূণ তৈরি হয়, সেটিকে ল্যাবের ইনকিউবেটরের ভেতর নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও পরিবেশে রেখে দেওয়া হয়। সেখানে ভ্রূণটির বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পঞ্চম ধাপ— সাধারণত দুই থেকে তিন দিন পর, যখন ভ্রূণটি জরায়ুতে স্থাপনের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত হয়, তখন চিকিৎসকরা খুব সতর্কতার সঙ্গে সেটিকে নারীর জরায়ুর ভেতরে প্রতিস্থাপন করেন। জরায়ুতে সফলভাবে বসে যাওয়ার পর ভ্রূণটি প্রাকৃতিকভাবেই বাড়তে থাকে।
কোথায় করাবেন?
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইভিএফ সেবা চালু হয়েছে। রোগীর চাপ অনেক বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন আগে থেকেই সিরিয়াল নিতে হয়। এখানে একটি আইভিএফ সাইকেলের খরচ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে আইসিআরসি, লুনিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফারটিলিটি কেয়ার সেন্টার এবং নোভা ফারটিলিটি সেন্টারের মতো বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত কেন্দ্র আইভিএফ সেবা দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একটি আইভিএফ সাইকেলের খরচ সাধারণত তিন থেকে চার লাখ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
সফলতার হার কতটা?
প্রতিটি আইভিএফ সাইকেলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সফলতার সম্ভাবনা থাকে। তবে এটি দম্পতির অবস্থাভেদে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বন্ধ্যাত্ব চিহ্নিত হলে প্রাথমিক অবস্থায় একজন আইভিএফ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। কেননা, বেশি দেরি হলে আইভিএফে সফলতার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা





