অটোনমিক নিউরোপ্যাথি
বয়স্কদের জটিল ব্যাধি

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ নামের একটি রোগের কথা উল্লেখ করেছেন। কী সেই রোগ? জানাচ্ছেন ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু
রহিম সাহেবের বয়স ৫৮ বছর। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস। কয়েক মাস ধরে লক্ষ করছেন, বিছানা বা চেয়ার থেকে উঠলেই মাথা ঝিমঝিম করে, কখনো মনে হয় পড়ে যাবেন। পাশাপাশি রয়েছে কোষ্ঠকাঠিন্য, প্রস্রাবের সমস্যা এবং আগের মতো ঘামও হয় না। হৃদরোগ, কানের সমস্যা কিংবা দুর্বলতা— সব পরীক্ষাই হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, সমস্যার মূল কারণ অটোনমিক নিউরোপ্যাথি।
শরীরের ‘অটোপাইলট’ ব্যবস্থা
শরীরের কিছু কাজ আমরা ইচ্ছা করলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। হৃদযন্ত্রের স্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ, ঘাম হওয়া, হজম, মূত্রথলির কাজ— সবই চলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এই পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে অটোনমিক স্নায়ুতন্ত্র। যখন এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তাকে বলা হয় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি। এটি বিভিন্ন রোগের কারণে সৃষ্ট একটি স্নায়বিক জটিলতা।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
অটোনমিক নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। বছরের পর বছর রক্তে শর্করা বেশি থাকলে ছোট ছোট স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এ ছাড়া ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি, কিছু অটোইমিউন রোগ, পারকিনসনস, অ্যামাইলয়ডোসিস, অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু সংক্রমণ, ক্যানসার এবং ক্যানসারের চিকিৎসাও এ রোগের কারণ হতে পারে।
লক্ষণগুলো বিচিত্র কেন?
এই রোগে শরীরের বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই লক্ষণও হয় নানা রকম। সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘোরা বা চোখে অন্ধকার দেখা। কারণ, তখন রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়। অনেকের হজমে সমস্যা হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া দেখা দেয়। কারও প্রস্রাবেও সমস্যা দেখা দেয়। পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন এবং নারীদের যৌন অস্বস্তিও হতে পারে। কেউ খুব কম ঘামেন, আবার কেউ অস্বাভাবিকভাবে বেশি ঘামেন। গরম সহ্য করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক রোগী রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে গেলেও তার স্বাভাবিক সতর্কতামূলক লক্ষণ অনুভব করেন না।
রোগ নির্ণয় কীভাবে?
রোগীর পুরোনো রোগের ইতিহাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শোয়া ও দাঁড়ানো অবস্থায় রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তন দেখা হয়। প্রয়োজনে টিল্ট-টেবিল টেস্ট, অটোনমিক ফাংশন টেস্ট, হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি পরীক্ষা এবং অন্যান্য বিশেষ পরীক্ষা করা হয়।
কখন সতর্ক হবেন?
দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস থাকলে এবং তার সঙ্গে বারবার মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা, প্রস্রাবের পরিবর্তন, ঘাম কমে যাওয়া বা যৌনক্ষমতার পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং মূল কারণের যথাযথ চিকিৎসা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগ
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিনস)




