সম্ভাবনার শহর সীমাবদ্ধতারও

লেখক, তার দুই কন্যা ও স্ত্রী
আমেরিকার মায়ামি শহরে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন সৈয়দ রায়হান উদ্দিন। লিখেছেন এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার কথা
ফ্লোরিডার মায়ামি বিমানবন্দরে যেদিন নামছিলাম, মনে হচ্ছিল অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। সময়টা ছিল ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর। মায়ামি বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় আমাকে নিতে এসেছিলেন আমার ফুফাতো ভাই ও কয়েকজন আত্মীয়। গাড়িতে উঠলাম। আমেরিকা মানেই আমার কাছে তখন উন্নত জীবন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমার সেই ধারণা ভেঙে গেল। ট্রাফিক সিগন্যালে কয়েকজন মানুষ গাড়ির কাছে এসে টাকা চাইছিলেন। আমি গাড়িতে থাকা বাকিদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা কী করছে?’ তাদের একজন বললেন, ‘ভিক্ষা করছে।’
আরও পরে মানুষকে অসহায় অবস্থায় দেখেছি, চিকিৎসা নিয়ে সমস্যায় থাকা মানুষ দেখেছি, অর্থের অভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থাকা মানুষ দেখেছি। তাই প্রথম দিনের সেই দৃশ্যটিকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা মনে হয় না। আমেরিকা সম্ভাবনার দেশ ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে অসমতা, দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব আর সংগ্রামের দেশও। দূর থেকে একটি দেশকে দেখা আর সেই দেশে বসবাস করা— এ দুইয়ের মধ্যে যে কতটা পার্থক্য, মায়ামি আমাকে সেটি খুব তাড়াতাড়ি বুঝিয়ে দিয়েছিল।
আমেরিকায় আসার পর আমার আরেকটি বড় অভিজ্ঞতা ছিল ভাষা নিয়ে। কখনো মনে হতো, আমি যা বলতে চাই, তার অর্ধেকও ঠিকমতো বলতে পারছি না। অবশ্য মায়ামিতে ইংরেজিই সবকিছু নয়। স্প্যানিশের ব্যাপক ব্যবহার আছে, ক্রিওলও আছে। ক্যারিবীয় ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের কারণে শহরের ভাষা ও সংস্কৃতি একেবারে আলাদা একটি চরিত্র পেয়েছে। একটা রাস্তায় হাঁটলে কখনো মনে হয়, এক শহরের ভেতর দিয়ে অনেক দেশ পাশাপাশি হাঁটছে।
কেউ স্প্যানিশ বলছে, কেউ ইংরেজি, কেউ ক্রিওল। কারও খাবারের ধরন আলাদা, কারও ধর্মীয় আচার আলাদা, কারও উৎসব আলাদা।
এখানে এলে টাকা উপার্জনের সুযোগ অনেক। মায়ামিতে এসে বুঝলাম, সুযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু কিছুই সহজে আসে না। নতুন দেশে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে নিজেকেও নতুন করে তৈরি করতে হয়
বাংলাদেশে থাকতে আমেরিকা নিয়ে আরেকটি ধারণা ছিল— এখানে এলে টাকা উপার্জনের সুযোগ অনেক। মায়ামিতে এসে বুঝলাম, সুযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু কিছুই সহজে আসে না। নতুন দেশে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে নিজেকেও নতুন করে তৈরি করতে হয়।
মায়ামিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির দিকে তাকালে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট। আমাদের কমিউনিটির বড় একটি অংশ গ্যাস স্টেশন, গ্রোসারি স্টোর, সুপার স্টোর— এসব সেক্টরে কাজ করছে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসাতেও অনেকে আছেন। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবর্তন দেখছি। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য যারা আসছে, তাদের অনেকে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, গবেষণা কিংবা অন্যান্য পেশায় যাচ্ছে। আমার নিজের জীবনেও পেশা বদলের অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশে আমি সরকারি চাকরি করতাম। কিন্তু যে কাজ করতাম সেটি এখানে চালিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। তাই নতুন করে শিখেছি, সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পড়াশোনা করেছি।
দীর্ঘদিন হলো মায়ামিতে আছি। এখানকার রাজনীতির ভালো-মন্দ সবই আমাদের প্রভাবিত করে। আমেরিকার রাজনীতিতে সম্প্রতি ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে। তবে মায়ামিতে বসবাস করতে গিয়ে আমি প্রগতিশীল ও উদার চিন্তার প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখেছি। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট ধারার রাজনীতির যে সাম্প্রতিক উত্থান, সেটি বেশ লক্ষণীয়। বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতাদের রাজনীতি এবং নিউ ইয়র্কের জোহরান মামদানিকে ঘিরে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিও তার একটি উদাহরণ।
২০০৫ সালে মায়ামিতে পা রাখা সেই একই মানুষটি আমি আর নেই। বদলে গেছে দেখার চোখ। আমেরিকা আমার কাছে এখন বহু সম্ভাবনা সহ, সীমাবদ্ধতার গল্পও বলে।



