ইবতিসাম অথবা মার্গারিটা

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি
ইরাকি এক ভদ্রমহিলা বেশ কদিন ধরে আমাকে বিরক্ত করে মাথা কুটি কুটি করে খেয়েছে সারাক্ষণ। উদ্দেশ্য, তার নতুন প্রাসাদোপম অট্টালিকাকে কালারফুল স্টেইনড গ্লাস দিয়ে সাজাবেন। আর্কিটেক্টের করা বাড়ির ইন্টেরিয়ার পোর্টরেইল দেখে অ্যামাউন্টের কথা মাথায় আসতেই যে কেউ লুফে নিতে চাইবে। কিন্তু আমার মনে তা না এসে ঘন কালো মেঘের ছায়া।
ভদ্রমহিলার কী নেই! যেমন রূপের উজ্জ্বল দ্যুতি, তেমনি চোখ ঝলসে যাওয়ার মতো আধুনিক পোশাকের পশ্চিমা জীবনযাপন, দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি— সবই আছে। কিন্তু খটকা লাগে তখন যখন দেখলাম, এত অর্থবিত্তের মালিক হওয়া সত্ত্বেও হাতের পাঞ্জা দিয়ে পানি গলতে চায় না। ভদ্রমহিলার বাবাকে দেখলে নব্বই দশকের ভারতীয় হিট মুভি ‘দিল’-এর অনুপম খেরের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, স্বয়ং রঙিন সেলুলয়েডের সেই ব্যক্তি আমার সম্মুখে। সেই ‘দিল’ মুভির চরিত্রের মানুষটি তার চায়ের কাপে পড়া মাছিটাকে ফেলে না দিয়ে গায়ে লেগে থাকা চা চুষে পান করতেন যেন এক ফোঁটা চাও বৃথা না যায়।
এই পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইরাকিদের সম্পর্কে মনে যখন একটা গড়পড়তা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছিলাম, ঠিক তখনই ঘটল আরেক ঘটনা। পরিচয় হলো আরেক ইরাকি নারীর সঙ্গে। নাম মিসেস ইবতিসাম। তার উদারতা, সৌন্দর্যবোধ এবং শিল্পপ্রেম আমাকে অভিভূত করেছিল।
একদিন অলস দুপুরে অফিসে বসে আছি, ঠিক সে সময় ফোনকলটি এলো। পরিচয় পর্বের পর পূর্ববর্তী প্রজেক্টের ছবিসমেত দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। পরদিন যখন তার বাড়ির সামনে পৌঁছালাম, মনে হলো কোনো এক শিল্পীর আঁকা দৃশ্যপট। পৌঁছাতেই নিজে এসে স্বাগত জানালেন।
সদ্য নির্মিত প্রাইভেট সুইমিংপুলের কাছে নিয়ে গিয়ে আর্কিটেক্টের নকশা দেখিয়ে ব্যাখ্যা করছিলেন। কথা বলতে বলতে অনুসরণ করে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পিঠে ধাক্কা...!
ফিরে তাকাতেই দেখি ফুটবল। তারপর শিশুদের অট্টহাসির কলরোল। মিসেস ইবতিসাম চোখ রাঙিয়ে তার বড় ছেলে আলিকে ডাকতেই সবাই চুপ হয়ে গেল। ম্যাডাম কিছুটা লজ্জিত হলো, কিন্তু আমি বিচলিত না হয়ে শিশুদের নিষ্পাপ দুষ্ট হাসিতে মুগ্ধ হলাম। আলির মুখের সেই নিষ্পাপ হাসি আজও আমার চোখে দেদীপ্যমান।
গৃহকর্মীকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম, আলি মারা যাওয়ার সংবাদ
প্রজেক্ট চলাকালীন মিসেস ইবতিসামের সঙ্গে সম্পর্কটা সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধুত্বে রূপ নেয়। মাঝেমধ্যে মনের গহিনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফরাসি বান্ধবী মার্গারিটা উঁকি দিত। কিছুদিনের মধ্যেই সুইমিংপুলের স্টেইনড গ্লাস ফেন্সিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। আমাদের আড্ডার দিনের সমাপ্তি। এরই মধ্যে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। প্রজেক্ট বুঝিয়ে দিয়ে বিদায়ের দিন ম্যাডামের কাছ থেকে একটা খাম পেলাম; উচ্চারণ করলেন, ‘দিস ইজ ফর ইয়োর ঈদি।’ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানতে চাইলাম, দেশ থেকে কী নিয়ে আসতে পারি? অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর খাঁটি নারিকেল তেলের কথা জানালেন। পাঁচ মাস দেশে অবকাশযাপনের পর আবার ফিরে এলাম আরব আমিরাতে। পরের দিন খাঁটি নারিকেল তেলের বয়াম নিয়ে ম্যাডামের বাসায় উপস্থিত হলাম।
ঘর জুড়ে নীরব নিস্তব্ধতা,
চারদিকে সুনসান। চঞ্চল শিশুদের কোলাহল নেই। ড্রইংরুমে বসে
অপেক্ষা করছি। কারও মুখে কোনো
শব্দ নেই, যেন অচেনা
অন্য কোনো বাড়ি। গৃহকর্মীকে
জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম, আলি মারা যাওয়ার
সংবাদ। সে থেকেই ম্যাডাম
নির্বাক মানসিক ভারসাম্যহীন। মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো।
অনেকক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো ছিলাম। চোখে
ভাসছিল প্রজাপতির মতো আলির দুষ্টুমাখা
নিষ্পাপ হাসির মুখখানি আর মিসেস ইবতিসামের
শিল্পপ্রেমী প্রাণ। অজান্তেই চোখ থেকে জল
গড়িয়ে পড়ল।
ছবি: লেখক





