ঢাকার বুকে পারস্যের জুলফা ইস্পাহান নগরীর স্মৃতিচিহ্ন

আর্মেনিয়ান চার্চ। ছবি: লেখক
ব্যস্ত নগরীর কোলাহল এড়িয়ে আরমানিটোলার শান্ত গলিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন ইমারত— ঢাকার আর্মেনিয়ান চার্চ। কালের প্রবাহে আজ তার জৌলুশ কিছুটা মলিন হলেও শ’দেড়েক কবরের এপিটাফে আজও অমলিন এক হারানো সম্প্রদায়ের গৌরবময় স্মৃতি। ইতিহাস-জড়ানো সেই আর্মেনিয়ানদের বিত্ত, প্রতিপত্তি ও চিরনিদ্রার এক মায়াবী উপাখ্যান লিখেছেন বাবু আহমেদ
পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নাম নিলেই মনে পড়ে যায় বিশাল আর্মেনিয়ান গির্জার কথা। খুব ছোটকালে যখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে স্কুলের অনুষ্ঠানের নাম করে ঢাকার রাজপথে ঘুরে বেড়াতাম। মা জানত আমি স্কুলে গেছি অনুষ্ঠান দেখতে। এরকম একদিন গুলিস্তান থেকে হেঁটে আবিষ্কার করে ফেলি আর্মেনীয় গির্জা। সদর দরজায় লেখা আছে নির্মাণকাল ১৭৮১ সালে। কিন্তু ঢোকার কোনো অনুমতি নেই, বিশাল আকারের সেই পুরনো নীল রঙের দরজাটি বন্ধ। বহুক্ষণ অপেক্ষার পর সামান্য সময়ের জন্য ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল, ভেতরে ঢুকে নানা নকশায় মার্বেল পাথর ও কষ্টিপাথরের অলংকৃত কবর দেখে অবাক হয়েছিলাম সেদিন। এর আগে এরকম চার্চ কখনো দেখিনি। মানুষগুলো মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত শত শত বছর কিন্তু তারা কি জানে তাদের কবরের ঢাকনার ফলকে এত চমৎকার অলংকার এবং সাল লেখা আছে, যা দেখে এই শতকের মানুষগুলো বিস্মিত হয়।
ইতিহাস আমাকে আনন্দ-বেদনা দুটিতেই ঘিরে রেখেছে। আর্মেনীয়রা ঢাকায় কবে প্রথম পা রেখেছিলেন, তা জানা যায়নি; তবে মুঘল আমলে ভাগ্য বদলাতে ১৭০০ শতকের গোড়ার দিকেই সম্ভবত আর্মেনীয়দের আগমন। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, একটি আর্মেনীয় প্রতিনিধিদল মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে প্রথম আসে ১৫৬২ সালে। তখন থেকেই আর্মেনীয়রা ইরানের জুলফা ও ইস্পাহান থেকে ভারত উপমহাদেশে এসে বসতি গড়তে থাকেন। সেই সুবাদে ১৭৮১ সালে তারা ঢাকায় এই গির্জাটি নির্মাণ করেন। প্রথমে সেখানে একটি গোরস্তান ছিল। গির্জা নির্মাণের জন্য গোরস্তানের আশপাশে বিস্তৃত জমিদান করেছিলেন ব্যবসায়ী আর্মেনীয় আগা মিনাস ক্যাটচিক। সে সময় আর্মেনীয়রা অতি ক্ষুদ্র একটি সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা শহরে ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী, কারণ তাদের ছিল বিত্ত। তাদের নামেই এ অঞ্চলের নাম হয় ‘আরমানিটোলা’। পোগোজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক চার্লস পোর্টের নামে এক অ্যাংলো চিত্রকের আঁকা যিশুখ্রিস্টের তৈলচিত্রটি শতাব্দীর পরিক্রমায় মলিন হলেও এখনো দেখার মতো। এর পাশেই ছিল একটি ঘড়ি সান ডায়াল (সূর্যঘড়ি)। এটি নির্মাণ করেছিলেন জোহানসন কারুপিয়েত সার্কিস। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে ঘড়িটি ভেঙে গেছে। চূড়ায় আছে চারটি শঙ্খচিল মিনার। ১৭৮১ সালে নির্মিত ৭৫০ ফুট লম্বা চারটি দরজা, ২৭টি জানালার এই গির্জা কালের প্রবাহে কিছুটা মলিন ও জীর্ণ হলেও দেখতে এখনো অসাধারণ।
গির্জার ভেতরের জমিতে গায়ে গা লাগানো শ’দেড়েক কবরের এপিটাফ আজ ঝাপসা ও ভাঙা। ঢাকায় একমাত্র জীবিত আর্মেনীয় বন্ধু মিখাইল মার্টিরোসেন, তিনি ২০২১ সালে ৭০ বছর বয়সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কানাডায় তার মেয়ের বাড়িতে মারা যান। তার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে। মিখাইল মার্টিরোসেন আমাকে এই চার্চ সম্বন্ধে নানা তথ্য দিয়েছেন।
আর্মেনীয় এ কবরস্থানে কিছু কবরের এপিটাফ রুশ হরফের মতো, তবে আর্মেনীয় হরফে লেখা। কিছু কবরে আবার শুধু ইংরেজি কিংবা ইংরেজি-আর্মেনীয় উভয় ভাষায় এপিটাফ লেখা আছে। পারস্যের জুলফা ও ইস্পাহান থেকে সপ্তদশ শতকে এ দেশে আসা বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয়র সমাধি আছে এই গির্জার কবরস্থানে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, ঢাকার আর্মেনীয় জনবসতির কোনো সংরক্ষিত ইতিহাস নেই। বর্তমানে ইরানের অধীন জুলফা নগরী ১৬০৫ সাল পর্যন্ত ছিল আর্মেনীয়র অন্তর্গত। ইরানের তদানীন্তন শাসক শাহ আব্বাস ১৬০৫ সালে আক্রমণ পরিচালনা করে জুলফার ১২ হাজার আর্মেনীয়কে ইস্পাহান নগরে পুনর্বাসন করেন। তখনই প্রচুর আর্মেনীয় ভারত উপমহাদেশে আসেন। মিখাইল মার্টিরোসেনের বক্তব্যেও এ তথ্যের আভাস পেয়েছিলাম।
জেমস ওয়াইজের গ্রন্থ থেকে আরও জানা যায়, ১৮৭২ সালে সারা বাংলায় বসবাসরত ৮৭৫ আর্মেনীয়র ৭৪০ কলকাতায় এবং ১৩ জন ঢাকা বসবাস করতেন। ১৮৭৩ সালে আই জি এন পোগোজের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় আর্মেনীয়দের সংখ্যা ছিল ১০৭, যাদের মধ্যে ৩৬ পুরুষ, ২৩ নারী, ৪৮ শিশু। তবে কবরগুলো সরেজমিনে গিয়ে দেখলেও বোঝায় আর্মেনীয়রা ঢাকায় বেশিদিন বাঁচতেন না, কারণ এখানকার বৈরী আবহাওয়ায় তারা খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে মারা যেতেন। চিরনিদ্রায় শায়িত এ মানুষগুলোর কবরে চোখ রাখলেই দেখা যায় ৮ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত।
উনিশ শতকে মুঘল রাজধানী ঢাকায় পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে যে কয়টি আর্মেনীয় পরিবারের নাম পাওয়া যায় সেগুলো হলো— পোগস, আরাতুন, পানিয়াটি, কোজা মাইকেল, মানুক, হানি ও সার্কিস। তাদের বিত্তের ভিত্তি ছিল ব্যবসা। আর্মেনীয় এই চার্চের ভেতরটা শান্ত ও নিরিবিলি। দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে।





