ঢাকার কালেক্টর ও শৌখিন চিত্রশিল্পী স্যার চার্লস ড’য়লি

স্যার চার্লস ড’য়লির আঁকা আঠার শতকের সাত মসজিদ ও সংলগ্ন এলাকা
ব্রিটিশ আমলে এ দেশে জ্ঞানচর্চায় কিছু উৎসাহী কর্মচারী এসেছিলেন। তারা সবাই আমলা, কাজ করতেন প্রশাসনের উচ্চপদে। এ দেশের প্রাচীন ইতিহাস আর ওই ঐতিহ্যের প্রতি ছিলেন তারা শ্রদ্ধাশীল। তাদের মধ্যে একজনের নাম উচ্চারণ করলে এই উপমহাদেশ এবং আমরা যারা মোগল রাজধানী ঢাকাতে আজও বসবাসরত এবং গবেষক, ফটোগ্রাফার সবাই শ্রদ্ধা য় নত হই, তিনি হলেন স্যার চার্লস ড’য়লি। ঢাকা নগরীর ইতিবৃত্তে যারা উৎসাহী তাদের কাছে স্যার ড’য়লি (১৭৮১-১৮৪৫) শুধু পরিচিত কোনো নাম নয়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সম্মানসূচক একটি অধ্যায়। আঠারো ও উনিশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকার চেহারা কেমন ছিল, তা জানতে হলে ড’য়লির আঁকা ছবির ভেতর দিয়েই ঢাকাকে চিনতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। কারণ ব্রিটিশ আমলে যত প্রখ্যাত ইংরেজ চিত্রশিল্পী ভারতবর্ষে এসেছিলেন, তাদের কেউই ঢাকায় আসেননি। ব্যতিক্রম শুধু স্যার ড’য়লি ও জর্জ চিনারি। তখন ক্যামেরা আবিষ্কার হলেও কেউ ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারের ভেতর দিয়ে ঢাকাকে দেখেননি।
স্যার ড’য়লি ঢাকায় এসেছিলেন সরকারি কালেক্টর হিসেবে প্রশাসনিক কর্মভার নিয়ে, মানে প্রথম সারির ডাকসাইটে ঔপনিবেশিক আমলা। কিন্তু ১৮০৮ সালে কালেক্টর হয়ে তিনি যখন ঢাকা আসেন, ইতিহাস কিন্তু তাকে মনে রেখেছে রাজকর্মচারী হিসেবে নয়, সংবেদনশীল চিত্রশিল্পী হিসেবে। তিনি কাব্যচর্চা করতেন, কিন্তু ছবি আঁকার যে হাত বিধাতা তাকে দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে ওই কাব্য প্রতিভার তুলনা হয় না। তিনি সরকারি চিঠি এবং কাগজপত্রে যত না কলম চালিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি কলম চালিয়ে রঙতুলির আঁচড় কেটেছেন ক্যানভাসে এ ঢাকাকে নিয়ে।
হয়তো তার ভেতরে একটা কথা বা চিন্তা কাজ করত যে, ‘আমার ছবি বলবে কথা যখন আমি থাকব না’। এই মহান শিল্পীর জন্ম ১৭৮১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলার মুর্শিদাবাদে। বলা চলে তিনিই প্রথম কোনো বেসামরিক নাগরিক, যিনি এই দেহাতি প্রজাসাধারণকে তাদের সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে অনুধাবনের এবং তাদের শান্তিপূর্ণ ও সম্মতির ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন। তার বাবাও ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।
স্যার চার্লস ড’য়লি অবসর নিয়ে ইতালিতে স্থায়ী হয়েছিলেন। সেখানে ১৮৪৫ সালে ৬৪ বছর বয়সেই এ মহান শিল্পী মহাপ্রয়াণে যান। মৃত্যুর ১৮১ বছর পেরিয়ে গেলেও তার সৃজনশীল কাজের আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া যায় না। তার পুরো কাজটাই লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। পুরো কাজের ডকুমেন্টেশনের ওপর একটা ‘পাবলিকেশন অ্যান্টিকুইটিস অব ঢাকা’ সর্বাধিক আদরণীয় অথচ দুষ্প্রাপ্যতম একটি বই, যা বাংলাদেশের কোনো গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় না।



