ঢাকায়ও শরৎ এসেছে

এই শরতে রাজধানীর আফতাব নগরে কাশফুলের সান্নিধ্যে একদল তরুণ-তরুণী । ছবি: আবু বকর সিদ্দিক নিবিড়
অনিন্দ্য আজাদ গত বুধবার তার বসের কাছে গিয়ে ছুটি চাইলেন। ছুটির কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করলেন, গাজীপুরে যাবেন শরৎ দেখতে। ইট-কংক্রিটের জঞ্জালে ঢাকায় শরৎ দেখা যায় না বলেই মনে করেন তিনি। কিন্তু শরৎ বা শরতের আকাশ কি আসলেই শুধু জেলাশহরের বা গ্রামের? রাজধানীর আফতাবনগরের খোলা মাঠ, বসুন্ধরা আবাসিকের পাশের কাশবন অথবা উত্তরার দিয়াবাড়ির মেট্রোরেলসংলগ্ন এলাকা অন্তত এ যুক্তির ঘোর বিরোধিতা করবে। কারণ রাজধানীর শরতের সৌন্দর্যও ততটাই মনোরম, যতটা গাজীপুর, ভোলা কিংবা রাজশাহীর গ্রামগুলোর।
এটা সত্যি যে, কংক্রিটের অন্তহীন জঙ্গল আর ফ্লাইওভারের তলায় জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির ক্লান্ত হর্ন; ধূলিধূসর এই ঢাকা শহরকে এক নাছোড়বান্দা যান্ত্রিক দানবে পরিণত করেছে। কিন্তু এ দানবের বুক চিরেও হঠাৎ একদিন ঋতু পরিবর্তন ঘটে, যা ধরা পড়ে তার আকাশচুম্বী ভবনের কোণে বেঁচে থাকা আকাশে। বর্ষার ভারী চাদর সরিয়ে ভাদ্রের সূর্যের তেজে যখন আকাশটা হঠাৎ ধুয়েমুছে নিখাদ নীল হয়ে ওঠে, তখন ইটের দেয়ালগুলোও যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে কানাকানি করে— শরৎ এসেছে, শরৎ এসেছে।
বাংলা পঞ্জিকায় ভাদ্র ও আশ্বিন— এ দুই মাস জুড়েই শরতের রাজত্ব। ভাদ্রের শেষে প্যাচপ্যাচে গরমের অবসানে যখন আশ্বিনের নরম হাওয়া বইতে শুরু করে, তখন প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির হৃদয়ও এক অলৌকিক আনন্দের দোলায় দুলে ওঠে। শরতেই শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের রুপালি বার্তা পাওয়া যায়। ফলে এ শহরের যান্ত্রিক ঘড়ি যতই নিখুঁত নিয়মে সেকেন্ডের কাঁটা মেপে চলুক না কেন, কাশবন আর সাদা মেঘের ভেলা ঠিক তাকে ওলটপালট করে দেবেই। হুট করে যখন সেই মেঘের ছটা ছাদের কার্নিশে বা জানালার গ্রিলে দাঁড়ানো চোখে এসে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অপরূপ বিস্ময়। ঢাকার আকাশ তখন আর ধূসর থাকে না; বরং সুদূর কোনো নীলিমার হাতছানি এসে লাগে কাঁচঘেরা বহুতল ভবনগুলোতে। সেই অন্তহীন নীলের বুকে তুলোর মতো ভেসে বেড়ানো মেঘের দল দেখে মনে হয়, ব্যস্ততার এ শহরেও আদিম কোনো সুন্দরের বাসা আছে। তবে যান্ত্রিক ঢাকার বুকে শরৎ শুধু আকাশের নীলিমায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে নগরবাসীর কর্মব্যস্ত বিকালের গন্তব্যে।
শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটে চলে ঢাকার প্রান্তর থেকে প্রান্তসীমায়, যেখানে ইট-কাঠের রাজত্ব ফুরিয়ে নদী কিংবা খোলা প্রাঙ্গণ শুরু হয়েছে, সেখানে অপেক্ষা করে এক অন্য ঢাকা। কেউ কেউ তো নিরিবিলি সময় কাটাতে পাড়ি জমান কেরানীগঞ্জ বা বসিলার ওপারঘেঁষা বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর চরাঞ্চল, উত্তরার দিয়াবাড়ি কিংবা রামপুরার আফতাবনগর। এসব জায়গায় গেলে মনে হয় শরৎ যেন নিজের হাতে বিছিয়ে দিয়েছে শুভ্রতার এক বিশাল গালিচা। বিকাল গড়ালেই শহরতলির কাশবনে নেমে আসে মানুষের মেলা। প্রিয় মানুষের হাত ধরে হেঁটে যাওয়া তরুণ যুগল, ঘাসের ওপর দৌড়ে বেড়ানো শৈশব কিংবা জীবনের হিসাব মেলাতে মেলাতে একটু খোলা হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেওয়া কোনো ক্লান্ত মানুষ—সবাই যেন এক সুতোয় গেঁথে যায়।
শুধু কাশবন নয়, শহরের ভেতরের রমনা পার্ক বা চন্দ্রিমা উদ্যানে সকালের দিকে হাঁটলে দেখা মেলে শিউলি ঝরা ঘাস আর শরতের অন্যরকম এক স্নিগ্ধতা। আগমনী ঋতুর এই রূপ শুধু দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবেও। তরুণ-তরুণীদের মাঝে সাদা কিংবা আকাশি রঙের পোশাকে কাশবনে ফটোসেশনের ধুম পড়ে যায়। পাশাপাশি ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর, ছায়ানট কিংবা শিল্পকলা একাডেমির আঙিনায় শরতের গান ও নানা আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন। তখন মনে হয়, ঢাকা শুধুই কিছু ইট-পাথরের ঠিকানা নয়; এ শহরের বুক জুড়েও এক গভীর মন খারাপ আর একটুখানি মায়া লুকিয়ে আছে।



