গল্পে ধাঁধা
বুমেরাং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘হ্যালো, কালাম? খবর কীরে তোর?’
‘পুলিশের খবর নেওয়ার জন্য কেউ ফোন করে নারে, বন্ধু। ঝামেলায় পড়লে ফোন দেয়।’
‘কথা সত্য, কথা সত্য। ঠিক আছে। তোর খবর বলা লাগবে না। ফুর্তিতে আছিস বোঝা যাচ্ছে।’
‘এবার কী চুরি হয়েছে? ভাবির গয়না নাকি বাগানের অর্কিড?’
‘ঠাট্টা করিস না। গয়না মানেই কোটি টাকার কারবার। আর অর্কিডের দাম নিয়ে কোনো আইডিয়া আছে তোর?’
‘আমার জন্য নয়নতারাই ভালো। তোমার মতো কোম্পানির মালিক হলে কথা ভিন্ন।’
‘ঘটনা আমার অফিসের। কর্মীরা যাতে একটু রিলাক্সে থাকে, এ জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা রাখি না। এ কারণে চুরিদারি লেগেই থাকে। গত মাসে অফিসের লোকজন কেয়ারটেকার মানে ওই অফিস অ্যাসিস্ট্যান্টকে বকাঝকাও দিয়েছিল। তার আবার টুকটাক হাতটানের অভ্যাস আছে।’
‘তো?’
‘এর মাঝে আবার একদিন আমার এক ম্যানেজার, রশিদ নাম, সে আবার কেয়ারটেকারকে চড়-থাপ্পড়ও দিয়েছিল।’
‘চাকরি থেকে বার করে দিসনি? ওহ, তুই আবার দিলদার হাতেম তাই।’
‘আগে কথা শোন। বিপদ এখানে না। ওই কেয়ারটেকার অফিসের এটা-সেটা, এই ধর পুরনো কিছু স্টেশনারি, টোনার এসব চুরিদারি করে। এবার ঘটনা ঘুরে গেছে। স্টোর থেকে নতুন কেনা একটা মেডিকেল ডিভাইস চুরি হয়ে গেছে। বিদেশ থেকে আনা। চোখ দেখে সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস বের করে দেয়। অনেক দাম। ৫০ লাখের কাছাকাছি। তোকে একটু আসতে হবে। মামলা-মোকদ্দমা পরে হবে। আগে জিনিসটা বের করে দে। আর...।’
‘আর কী?’
‘ইয়ে মানে, এবার সবাই সন্দেহ করছে সেই ম্যানেজারকেই। আমি খুব বিব্রতকর অবস্থায় আছিরে। তুই এসে পড়। তোর মাথায় তো দু-চারটা শার্লক হোমস থাকে।’
‘ওকে দোস্ত।’
নিউ সামান্তা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অফিসে সাদা পোশাকেই এসেছেন ইন্সপেক্টর কালাম। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঘটনাস্থল দেখছেন। সিঁড়ি থেকে স্টোররুমের দরজা পর্যন্ত পরিষ্কার জুতার ছাপ। ছাপ স্পষ্ট, কেননা জুতায় কাদা লেগে ছিল। দুটো পায়ের দুটো ছাপ। দেখে বোঝা যায়, গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়েছে। সিঁড়ি থেকে সোজা স্টোররুমের দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে ছাপ। এর বাইরে আর কোনো ছাপ নেই।
‘এই জুতা ম্যানেজার রশিদের?’
‘হ্যাঁ, এতদিনের বিশ্বস্ত ম্যানেজার। সে এই কাজ...।’
‘কেউ দেখেছে? চাবি থাকে কার কাছে?’
‘আমি ছাড়া ম্যানেজার রশিদ, কেয়ারটেকার ঝন্টু... আর... আর... আর কারও কাছে থাকে না মনে হয়।’
‘লাগবে না। ব্যাপারটা পরিষ্কার। ডাক তোর ম্যানেজার আর কেয়ারটেকারকে।’
‘কী মুশকিল। আবার এসব ইন্টারোগেশন...।’
‘মেশিন ফেরত না পেলেও চলবে? তাহলে আমি যাই।’
‘ওহ। ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
মিটিং রুম। থমথমে মুখে বসে আছেন ইনভেন্টরি ম্যানেজার রশিদ। এরই মধ্যে সবাই জেনে গেছে, তিনি গত রাতে অফিসে ঢুকেছেন। অফিসের কাজেই নাকি আসতে হয়েছিল।
মিটিং রুমের চেয়ারে বসে আছে ঝন্টু। সে আড়ষ্ট। এসব চেয়ারে তার বসার পারমিশন নেই।
কোম্পানির মালিক আলতাফ হোসেন তার বন্ধু ইন্সপেক্টর কালামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
‘ও, এর মধ্যে পুলিশও হাজির!’
গজগজ করে উঠলেন রশিদ।
‘আইব না? কী কন! এত দামি মেশিন চুরি গেল!’
কটমট করে ঝন্টুর দিকে তাকালেন রশিদ। ঘাবড়ালো না ঝন্টু। সে সকাল থেকে বলে আসছে, ঘটনায় কঠিন গিট্টু আছে। এবার ঘাগু চোর নাকি ধরা পড়েছে।
‘ঝন্টু, আপনি কোথায় ছিলেন কাল রাতে?’
‘আমি আর কই থাকব। মহাখালীতে আমার মেসে।’
অফিসের সবাই ডাকে তুমি করে। পুলিশের মুখে আপনি শুনে মিইয়ে গেল ঝন্টু।
‘কয়টা থেকে কয়টা?’
‘অফিস থেকে বের হইয়াই বাসায় গেছি। এরপর আর কোনোদিকে যাই নাই।’
‘মেসে কারা কারা থাকে?’
‘থাকে তো। মিজান, রফিক এরা থাকে।’
‘কী করে ওরা?’
‘জে, ওরা কাম-কাইজ করে। একজন আছে রবিউল। তার মামা আপনের মন্ত্রীর এপিএস-এর বন্ধু।’
‘ওদের ফোন নম্বর নিশ্চয়ই সেভ করা আছে। দিন তো একটু আমাকে।’
ঘটনার আগপাছ ধরতে পারছে না ঝন্টু। বিপদে পড়ার কথা কার আর জেরা করা হচ্ছে কাকে। তাও আবার চুরি থেকে ঘটনা গড়িয়েছে তার মেস-মেটদের কাছে।
‘জি স্যার, জুতার ছাপ তো...।’
‘ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। দেখেছি। ওটা দেখেই তো এখন আপনার রুমমেটের নম্বর চাইছি। অ্যালিবাই বলে একটা ব্যাপার আছে, জানা আছে?’
‘আলি ভাই নামে কাউকে চিনি না।’
‘দরকার নেই। কাল রাতে পুরোটা সময় রুমে ছিলেন কিনা, এ ব্যাপারে উনাদের একটু জিজ্ঞাসা করব।’
এবার ম্যানেজার রশিদের দিকে হাসিমুখে তাকালেন ইন্সপেক্টর কালাম।
‘আর হ্যাঁ, রশিদ সাহেব, জুতার ছাপটা তো আপনার জুতারই?’
ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন ম্যানেজার রশিদ। প্রশ্ন শুনে ফের চুপসে গেলেন।
‘জি, আমার। জুতাটা অফিসেই রেখে যাই। ব্যস্ত থাকি, কখন কী পায়ে বের হই, সেটিও মনে থাকে না।’
‘এখন বৃষ্টি-বাদলার সিজন নেই। গত রাতে বৃষ্টিও হয়নি। অফিসের আশপাশে কাদাও দেখলাম না।’
‘জি, ঠিক।’
‘যাই হোক। জুতা দেখতে হবে না। কাদাও থাকতে হবে না। তার আগে ঘটনা পরিষ্কার।’
ঝন্টু তার রুমমেটের নম্বর এগিয়ে দিল।
‘এই যে স্যার নম্বর। তবে স্যার, ওরা আবার কী বলতে কী বলবে। ওদের কথাবার্তার নাই ঠিক। ওরা আবার হালকা গাঁজা-টাঁজা খায়।’
‘ঠিক আছে মানলাম, এখন ওরা যদি গাঁজা খেয়ে এটা বলে যে কাল রাতে আপনি ভারী একটা বাক্স নিয়ে আপনার রুমে ঢুকেছেন। তা হলে বিশ্বাস করব?’
‘কী বলেন, স্যার! এটা কেন বলবে। আবার ধরেন, কইতেও পারে। দুনিয়াদারির বিশ্বাস নাই।’
‘শুনুন, আপনি কাজটি করেছেন। কেন করেছেন, সেটিও পরিষ্কার। জুতার ছাপ বসিয়ে এত সহজে কাউকে ফাঁসানো যায় না। এখন ভালোয় ভালোয় জিনিসটা ফেরত নিয়ে আসুন। মামলা-টামলা হবে না। কী বলিস, বন্ধু?’
‘না... ইয়ে মানে। তার দরকার নেই। কিন্তু কেন? কীভাবে? মানে...।’
‘এত ব্যাখ্যা করতে ইচ্ছা করছে না। শুধু এটা নিশ্চিত থাক যে জুতার ছাপটা সাজানো।’
‘সাজানো? বৃষ্টি না হলেও তো ধর অন্য কোথাও থেকে কাদা...।’
‘বৃষ্টি না হলেও ঘটনা সাজানো।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু... ঝন্টু?’
‘ঝন্টু এখন মেশিনটা নিয়ে আসবে। ভুল করে নিয়ে গিয়েছিল। তাই না ঝন্টু?’
‘জি স্যার। হইতে পারে। ভুল কইরা নিয়া গেসি। রুমের ওই মিজান, রফিক্কাদের চক্করে কী না কী খাইসি। দিশা পাই না।’
ম্যানেজার রশিদের শীতল চাহনি দেখে ঢোক গিলল ঝন্টু।
মনে মনে ঠিক করেছে, মেশিনটা অফিসের গেটে রেখেই
ঝেড়ে দৌড় দেবে।
ইন্সপেক্টর কী করে নিশ্চিত হলেন, জুতার ছাপ সাজানো?



