গল্পে ধাঁধা
বাঘবন্দি

আঁকা : অরবিন্দ হালদার
উইকএন্ডে ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাওয়াই শিহাবের আনন্দ। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর বেড়াতে এসেছে। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ তাকে টানে। কাজের অবসরে সুযোগ পেলেই তাই ঢাকার অদূরের এই জঙ্গলে বেরিয়ে আসে শিহাব। অনেক সুন্দর সুন্দর মনোরম রেস্টহাউজ, পিকনিক স্পট ও শুটিং স্পট আছে। সেখানে একটু বেশি খরচ হলেও থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। সেরকমই একটা রেস্টহাউজে উঠেছে শিহাব। তবে এর সাজানো-গোছানো পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করতে পারে না। জঙ্গলের ভেতর দ্বিধাহীন চিত্তে ঘুরে বেড়াতেই যত মজা।
দুপুরের ভাতঘুম শিহাবের কাছে অসহ্য। শরীরকে অলস করে দেয়। আর বেড়াতে এসে পড়ে পড়ে রেস্টহাউজে ঘুমানো কোনো কাজের কথা নয়। বিকালের হাওয়ায় হাঁটতে হাঁটতে রেস্টহাউজ ছাড়িয়ে জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে চলে এলো। ততটা বুনোট জঙ্গল না হলেও শালগাছের সারি এদিকটায় কিছুটা ঘন। এ সময় সাপখোপ খুব একটা বেরোয় না। আর এই জঙ্গলে হিংস্র কোনো জন্তু নেই বলেই তার জানা। ফিরবে মনস্থির করেও সামনের ছায়ায় ঢাকা দূরবিস্তৃত প্রান্তর দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার যুগে এতটা খোলা প্রান্তর আর সহজে চোখে পড়ে না। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ফুরফুরে হাওয়া বয়ে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে একটু পিপাসা পেয়েছে শিহাবের। একটু দূরে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে একটা বাড়ি চোখে পড়ল। দালানবাড়ি। বেশ পুরনো, সেটি বোঝা যাচ্ছে। সে পা চালিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। বাড়ি যখন, তখন নিশ্চয়ই পানি পাওয়া যাবে। হয়তো ওটাও কোনো রেস্টহাউজ হবে।
শেষ বিকালের আলো মরে আসতে শুরু করেছে। বিস্তীর্ণ প্রান্তর লালিমায় লাল হয়ে উঠছে। পুরনো বাড়িটার সামনে ঘাসে ঢাকা জমির ওপর একটা বাগান আর তার চারদিকে কেয়ারি করা ফুলের গাছ। নিশ্চয়ই এটি শুটিং স্পট। বাড়িটির দেয়ালের পাশ দিয়ে বড় বড় গাছ উঠে গেছে। চত্বরের এক পাশে একটা গোল পুকুর। ঠিক মাঝখানে পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে শ্বেত পাথরের বিবসনা পরী। পরীর দুহাত মাছ জাপটে ধরে আছে। মাছের মুখ দিয়ে পানির ফোয়ারা ছুটছে।
বাড়ির সামনের দরজা খোলা। শিহাব খোলা দরজা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটার দিকে গেল। সূর্য পুরোপুরি অস্তমিত। সন্ধ্যার ঝাপসা অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে।
বাড়ির দরজা বন্ধ। দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আগে কী মনে করে পাশের জানালার কাছে এলো। ক্ষীণ একটা আলোর রেখা বাইরে এসে পড়ছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুঝতে পারল, ওটা মোমের আলো। ঘরের ভেতর লোকজন আছে, সেটিও বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারা নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত যে কেউ জানালার দিকে নজর দিল না। শিহাব শব্দ করতে গিয়েও থেমে গেল। এখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ গোপন বৈঠক চলছে হয়তো।
বিশালাকৃতির ডিম্বাকার একটা টেবিলে চারজন লোক বসে আছে। সবাই সবার মুখোমুখি। অথচ শিহাব একজন ছাড়া আর কারও মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। পাশের থেকে কিছুটা দেখা গেলেও সে দেখায় মোমের ক্ষীণ আলোয় মুখ বলে মনে হয় না। আর যে লোকটার মুখ সে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে, সে লোকটাও জানালার দিকে তাকিয়ে নেই। একটা আয়নার ভেতরে লোকটার মুখ ধরা পড়েছে।
সবাই টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝবয়সী লোকটি বেশ দ্রুত কথা বলে যাচ্ছে। রাগে তার চোখমুখ লাল আর বিকৃত হয়ে উঠেছে। বাকি তিনজনের একজন দুহাতে কান ঢেকে অসহায় আর্তনাদ করছে। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, কান ঢাকা লোকটাই দোষী। আর একজন দুহাতে একটা ছটফট করতে থাকা ময়না পাখি ধরে আছে। অন্যজনের হাতে হাতকড়া। হাড়কড়া পরা লোকটি বসে আছে নিশ্চলভাবে। টেবিলের ওপর একটা ফলের ঝুড়ি আর তার সঙ্গে একটা চকচকে ছুরি রাখা আছে। ছুরিটা টেবিলের ঠিক মাঝখানে। আর ছুরির ঠিক পাশে একটা লোডেড পিস্তল। পিস্তলটা চারজনের সবার থেকে সমান দূরত্বে। শিহাব লোকটার কোনো কথা শুনতে পাচ্ছে না। শুধু ঠোঁট নড়া দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ লোকটা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর টেবিলে সজোরে দুহাতে মুষ্ঠাঘাত করল। সেই আঘাতে ঝুড়িটা একদিকে কাত হয়ে ফল গড়িয়ে টেবিলের নিচে পড়তে লাগল। ঝনাৎ শব্দ করে ছুরিটাও পড়ল টেবিলের ওপর। দ্রুত একটি হাত ঝট করে টেবিলের ওপর থাকা ছুরিটা তুলে নিল। কান ঢাকা লোকটিও ঠিক সেইভাবে উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক তখনই কেউ একজন ফুঁ দিয়ে টেবিলের ওপর থাকা মোমবাতিদানে জ্বলতে থাকা এক মাত্র মোমবাতিটি নিভিয়ে দিল।
আর তার পরেই মৃত্যু যেন ছড়িয়ে পড়ল ঘরের মধ্যে। পিস্তলের গুলির শব্দে গোটা ঘর প্রকম্পিত হয়ে উঠল। একটা আগুনের ঝিলিক দেখা গেল। চেয়ার থেকে সটান গড়িয়ে টেবিলের পাশে মেঝেতে পড়ল একজন। ময়না পাখির পাখা ঝাপটার শব্দ শোনা গেল। শিহাবের কান ঘেঁষে জানালা গলে উড়ে গেল ময়না পাখিটি। ক্ষিপ্র হাতে ছুড়ে মারা ছুরি বিঁধে গেল একজনের বুকে। বুক চেপে চেয়ারের ওপর বসে পড়ল ছুরিবিদ্ধ লোকটি। তারপর মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে নিশ্চল হয়ে গেল।
একজন লোক জানালার দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ভয়ে শিহাব জানালা ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে এলো। জীবন বাঁচাতে নিজেই যখন ছুটে বেরিয়ে যাবে, তখনই সপাটে দরজা খুলে গেল। লোকটা শিহাবের শরীর প্রায় ছুঁয়ে গেলেও তাকে যেন দেখতেই পেল না। শুধু রক্তের ছিটেফোঁটা এসে লাগল শিহাবের গায়ে। লোকটার জ্বলন্ত চোখ দুটো যেন কিছুই দেখছিল না। কিন্তু শিহাব লোকটাকে দেখতে পেয়ে চিনতে পারল। সে পেট চেপে ধরে শিহাবের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এত তাড়াতাড়ি জঙ্গলের মধ্যে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল যে শিহাব
হতভম্ব হয়ে গেল।
হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠতেই প্রাণভয়ে ছুটতে লাগল। একটা ঝোপের আড়ালে ঢুকে নিজেকে একটু ধাতস্থ হতে দিল। ঘটনাটা কী ঘটেছে আর কে কী ঘটিয়েছে, তা যেন একটু একটু করে বুঝতে পারল। ঘরের ভেতরে কেউ একজন খুন হয়েছে। আর ছুরিবিদ্ধ হয়েছে আরেকজন। একজন তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে।
রাতটা কোনোমতে রেস্টহাউজে কাটিয়ে দিল। পরদিন সকালে টিভি বা সংবাদপত্রে এখানকার কোনো হত্যাকাণ্ডের খবর শোনা গেল না। শিহাব রেস্টহাউজের আশপাশেও খোঁজ নিল। কেউ কোনো হত্যাকাণ্ডের কথা জানে না। স্থানীয় থানায় খবর নিল। থানা থেকেও কোনো খবর বের করতে পারল না। শিহাব ভাবল, পুলিশ সম্ভবত নিজেদের স্বার্থেই ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছে।
ছুটির দিনটা মাটি হবে ভেবেও রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য শিহাব আবার দীর্ঘ পথ হেঁটে সেই বাড়িটার দিকে গেল। দিনের আলোয় বাড়িটার দিকে ভালোভাবে নজর দিয়ে ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। গেটের কাছেও ছোট্ট করে একটা সাইনবোর্ড ঝোলানো আছে। নিরিবিলি শুটিং স্পট।
শিহাব বাড়িটার ভেতরে গেল। শুটিং ইউনিটের লোকজন তখন প্যাকআপে ব্যস্ত। এখানকার শুটিং শেষ। পরের দৃশ্যের জন্য তারা অন্য জায়গায় যাবে।
ইউনিটের একজন দেখতে পেয়ে শিহাব জিজ্ঞেস করল, ‘কাল সন্ধ্যার সময় কে খুন হয়েছিল?’
‘কেউ খুন হয়নি।’ গোমরামুখো লোকটা জানাল।
শিহাব আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে বাস্তব খুন না। সিনেমার দৃশ্যে। মানে আমি বলতে চাইছিলাম, কার বুকে গুলি লাগে।’
‘ওটাই তো ডিটেকটিভ থ্রিলার মুভি কে বাঘবন্দি খেলা’র টুইস্ট। বলে দিলে তো গোমর ফাঁক হয়ে গেল। ছবি রিলিজ হলে সিনেমা হলে গিয়ে দেখে নেবেন।’ লোকটা একটু থেমে বলল, ‘তবে শুটিং দেখে থাকলে তো রিলিজ হওয়ার আগেই বুঝতে পারার কথা। মাথায় যদি একটু বুদ্ধিশুদ্ধি থাকে।’ তারপর প্যাকআপে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
শিহাব মাথা চুলকাতে চুলকাতে শুটিং হাউজ থেকে বেরিয়ে এলো। আর তখনই তার কাছে দিনের আলোর মতো গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
শিহাব বুঝতে পারল শুটিংয়ে কে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল!
পাঠক বলুন তো শুটিংয়ে কে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল? ছুরিকাঘাতের শিকার হয়েছিল কে? আর গুলি
করেছিল কে?
মুষ্ঠাঘাত করা লোকটি?
কানে হাত দেওয়া লোকটা?
ময়না পাখি হাতে ধরে রাখা লোকটা? নাকি
দুহাতে হাতকড়া পরা লোকটা?



