গল্পে ধাঁধা
ভুতুড়ে বাড়ি
- উত্তর পাঠাতে হবে ৪ নভেম্বরের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অক্টোবরের শেষ। ভারতের সীমান্তঘেঁষা মাধবপুরের রামপুর গ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই খালাতো বোন সামিরা আর অনামিকা ঢাকা থেকে নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছে। ছোট খালা সেলিনা পারভীন বাড়িতে একা থাকেন। স্থানীয় কলেজের ইতিহাস শিক্ষক সেলিনা খালা ওদের আসার কারণে কয়েক দিন ছুটি নিয়েছেন।
ওদের গ্রামটা দারুণ লাগছে। মানুষগুলো বেশ ভালো। তবে সন্দেহজনক কিছু ব্যাপার আছে, বিশেষ করে ভারতের সীমান্তঘেঁষা রসুলপুর গ্রামের দিকে যে রাস্তাটা গেছে, তার পাশের পোড়াবাড়িটা ঘিরে অদ্ভুত এক রহস্য ডালপালা মেলেছে।
এক সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময় অনামিকা খালাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘খালা, আপনাদের গ্রাম থেকে বের হওয়ার পর রাস্তার পাশের পোড়াবাড়িটা নিয়ে গ্রামের মানুষের এত ভীতি কেন? মনে হয় যেন কোনো নিষিদ্ধ জগৎ!’
সেলিনা খালা কাপে চুমুক দিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘বছর দশেক আগে শৌখিন এক মানুষ খুব শখ করে বাড়িটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু মালিক ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পর সেখানে আর কেউ পা মাড়ায়নি। কোনো কেয়ারটেকার নেই, ভাড়াটিয়া নেই। কারণ একটাই— গ্রামের মানুষের অন্ধ বিশ্বাস, বাড়িটা আস্ত একটা ভূতের আস্তানা। সন্ধ্যা নামলেই নাকি ওই বাড়ি থেকে কখনো কখনো অদ্ভুত খনখনে হাসি আর নীলচে আলোর ঝলকানি দেখা যায়। ওমুখো কখনো যাওয়ার ভুল করো না।’
কিন্তু সামিরা আর অনামিকার ভূত-প্রেতে বিশ্বাস নেই। গত দুই রাতেও তারা হাঁটতে হাঁটতে ওই বাড়ির কাছাকাছি গিয়েছে। ওই পোড়াবাড়ির দিকে নীলচে আলোর খেলা দেখেছে। খালার শত সতর্কবাণী আর নিষেধ উড়িয়ে দুই বোন ঠিক করল, হ্যালোউইনের ঠিক আগের রাতে তারা এই রহস্যের গোড়ায় পৌঁছাবে। তারা নিজেদের মতো করে গ্রামের নানা মানুষের গতিবিধি খেয়াল করতে শুরু করে।
মুদি দোকানদার হাশেম মিয়াকে দেখা যায় সারা দিন গম্ভীর মুখে দোকানে বসে থাকতে। একদিন দোকানে দাঁড়িয়ে অনামিকা যখন একটু বেশি কৌতূহল দেখিয়ে জানতে চাইল, ‘চাচা, রাতে ওই ফাঁকা রাস্তার ওদিকে কীসের যেন শব্দ পাওয়া যায়?’ হাশেম মিয়া তখন চোখ বড় বড় করে ধমকের সুরে বলে উঠেছিল, ‘সাবধান মা! পেত্নীর আছর লাগলে রক্ষা নাই। বাড়ি যাও বলছি!’ অথচ গভীর রাতে সেই হাশেম মিয়াকেই সাইকেলের চাকার মৃদু শব্দে ওই রাস্তার দিকে মিলিয়ে যেতে দেখা যায়।
খালার বাড়ির মালী আসাদের আচরণ আরও সন্দেহজনক। পোড়াবাড়িটার নাম শুনলেই তার মুখটা সাদা হয়ে যায়। আবার এলাকার প্রভাবশালী মকবুল মাস্টারও মাঝেমধ্যে গভীর রাতে পকেটে ওয়াকিটকি জাতীয় কিছু নিয়ে সীমান্ত এলাকার দিকে হাঁটাহাঁটি করেন।
গ্রামের ভেতরে কৌতূহলী চোখে তাকাতে গিয়ে দুই বোন লক্ষ করল আরও কিছু অমিল। কয়েক মাস ধরে এলাকার যুবকের অনেকেই হঠাৎ করে দামি বাইক চালাচ্ছে, অথচ তাদের আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস নেই। কিছু বাড়ি পাকা হয়ে গেছে। অথচ বাড়িগুলোর মালিকরা হঠাৎ বড়লোক হওয়ার কারণ নেই, বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা গ্রাম রসুলপুর ঘিরে এটা ঘটছে। স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানে কান পাতলে শোনা যায় অদ্ভুত সব ফিসফিসানি। কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। সামিরা তার ছোট একটি নোটবুকে সব পয়েন্ট এক জায়গায় করতে শুরু করল। তার সন্দেহ ক্রমে ঘনীভূত হতে লাগল, এই পোড়াবাড়ির ভূতের গল্পের আড়ালে অন্য কোনো ভয়ংকর অপরাধের বীজ লুকিয়ে আছে।
২৯ অক্টোবর গভীর রাতে কুয়াশা যখন চারপাশ এমনভাবে ঢেকে দিল যে হাত বাড়ালেও নিজের হাত দেখা যায় না, তখন সামিরা আর অনামিকা টর্চলাইট হাতে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ির পেছনের খোলা মাঠ পেরোনোর সময় কনকনে ঠান্ডায় তাদের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। অনামিকা কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল, ‘সামিরা, ফিরে গেলে হয় না? আমার বুকটা কেমন যেন কাঁপছে।’ সামিরা শক্ত করে বোনের হাত ধরে বলল, ‘ভয় পাস না, অনামিকা। আজ এই ভুতুড়ে মিথের আসল রূপটা আমাদের দেখতেই হবে।’
পোড়াবাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বাতাসে ভেসে এলো সেই পরিচিত খনখনে হাসি। বুক কাঁপানো আতঙ্কে অনামিকা সামিরার হাত খামচে ধরে ফিসফিস করে উঠল, ‘সামিরা, দেখ! সত্যি বলছি, ওখানে ছায়া নড়ছে!’ বাড়ির দোতলার ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে মৃদু নীলচে আলো জ্বলছে। ওরা একটা পুরনো রেইনট্রি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভারী বুটের শব্দ আর গোঙানি শোনা গেল। দেখা গেল, টর্চ জ্বেলে পোড়াবাড়ির মূল গেট খুলছে লম্বা একটা ছায়া। ভেতর থেকে বিকৃত গলার আওয়াজ এলো, ‘তাড়াতাড়ি কর, জিনিসগুলো ভেতরে গুছিয়ে রাখ।’ এরপর বস্তা কাঁধে ভেতরে প্রবেশ করল মোটাসোটা একটা লোক! তবে চেহারাটা পরিষ্কার বোঝা গেল না। তাদের এই গোপন তৎপরতা দেখে দুই বোনের বুক থরথর করে কেঁপে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার কাচের ওপাশ থেকে ভেসে এলো মোবাইল ফোনের রিংটোন। ভেতরের মোটা লোকটা ওটা ধরল। লাউডস্পিকারে শোনা গেল, ‘সুরেশ ভাই জানতে চেয়েছে মালামাল ঠিকঠাক পৌঁছাল কিনা?’
সামিরা দ্রুত তার ডায়েরিতে নোট করে নিল সবকটি টুকরো ক্লু। বাড়িটার ভেতরে কোনো অতিলৌকিক ব্যাপার নেই; বরং ভূতের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার একটা মস্ত বড় ফন্দি চলছে এখানে। পরের দিনগুলোতেও সামিরা চুপচাপ গ্রামের বাজারে খোঁজখবর নিয়ে আরও অনেক তথ্য পেল— সব মিলে জটটা পরিষ্কার হয়ে গেল। তারপর ঢাকায় মামাকে ফোন দিল। তার বন্ধু পুলিশের ডিআইজি। অপরাধীদের ধরা পড়া শুধু বাকি।
পাঠক বলুন তো, পোড়াবাড়িতে কী চলছে? কারা অপরাধী?



