কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জাদুমন্ত্র

অনুশীলন ও প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দক্ষ করে তোলে। মডেল: জান্নাত নিপু। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয়কে করমুক্ত করা হয়েছে। তুলে নেওয়া হয়েছে ভ্যাটও। সৃজনশীল এই মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার নানা দিক নিয়ে লিখেছেন স্বর্ণা রায়
১৯৯৬ সালে ‘কনটেন্ট ইজ কিং’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন বিল গেটস। তখনো আন্দাজ করা যায়নি, একসময় কনটেন্ট ক্রিয়েশন এমন আবেদনময় ক্যারিয়ার হয়ে উঠবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম— যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ব্লগ বা ওয়েবসাইটে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে তথ্যবহুল, শিক্ষামূলক বা বিনোদনধর্মী কনটেন্ট তৈরি এবং সেগুলো প্রকাশের মাধ্যমে উপার্জনের এ দারুণ পন্থা সারা দুনিয়ায় ভীষণ আকর্ষণীয়।
কনটেন্ট ক্রিয়েশন কোনো গতানুগতিক পেশা নয়। এতে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চাইলে শুরুতেই তিনটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমত, শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, কাজটির প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। কারণ, নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করতে আগ্রহ ও ধৈর্য দুটোই প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অন্যের কনটেন্ট নকল না করে নিজস্বতার স্বাক্ষর রাখা দরকার। মানুষ কেন আপনার কনটেন্ট দেখবে, এ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, এ কাজে প্রচুর পরিশ্রম প্রয়োজন। একটি ভালো ভিডিও তৈরির জন্য গবেষণা, চিত্রনাট্য লেখা, শুটিং, এডিটিং এবং থাম্বনেল তৈরিতে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়।
অন্যের কনটেন্ট নকল না করে নিজস্বতার স্বাক্ষর রাখা দরকার। মানুষ কেন আপনার কনটেন্ট দেখবে, এ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন
বিষয় নির্বাচন
কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা নেই। তাই নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করাই ভালো। বাংলাদেশে আয়মান সাদিক বা মুনজেরিন শহীদের শিক্ষামূলক কনটেন্ট যেমন জনপ্রিয়, তেমনি নাদির অন দ্য গোর নাদির ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্টের জন্য দর্শকদের কাছে বেশ সমাদৃত। আবার মিস্টার বিস্টের বড় বাজেটের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, সফল হওয়ার জন্য জনপ্রিয় ট্রেন্ডের পেছনে ছোটা জরুরি নয়। বরং এমন একটি বিষয় বা উপস্থাপনার ধরন বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যা দর্শকদের সামনে নতুন কিছু উপস্থাপনের পাশাপাশি স্বয়ং কনটেন্ট ক্রিয়েটরকেও আনন্দ দেয়।
প্রয়োজনীয় দক্ষতা
ভালো কনটেন্ট তৈরির জন্য শুরুতেই দরকার গবেষণার অভ্যাস এবং আকর্ষণীয় কনটেন্ট লেখার ক্ষমতা। এরপর ভিডিওগ্রাফি ও লাইটিং সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে, যাতে ভিডিও দেখতে সুন্দর লাগে। এরপর আসে ভিডিও এডিটিং। কাটছাঁট, সাউন্ড ডিজাইন ও কালার গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে ভিডিওকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা যায়। পাশাপাশি থাম্বনেল ডিজাইন এবং এসইও সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে কনটেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। সবশেষে, ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সৃজনশীল চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয়ই একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সফল করে তোলে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, কনটেন্টের ধারাবাহিকতা এবং সৃজনশীলতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে -কামরুন নাহার ডানা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডানা ভাই জোশ
কোথায় শিখবেন
বাংলাদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার জন্য বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম
১০ মিনিট স্কুল: ডিজিটাল মার্কেটিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ওপর বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করে এই প্ল্যাটফর্ম। ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে এসব কোর্স করা যায়।
শিখবে সবাই: ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও কনটেন্ট তৈরির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে। এই প্রতিষ্ঠানের লাইভ ক্লাসগুলো বেশ জনপ্রিয়।
শুরুতেই অতিরিক্ত কোলাবোরেশনের দিকে না গিয়ে নিজের পরিচয় ও কাজের ধরন তৈরি করা ভালো -রাকিন আবসার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর মি. আবসার
অফলাইন প্রতিষ্ঠান
ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট: এটি দেশের অন্যতম বড় আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এখানে ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও উপকারী।
মূলত সৃজনশীল চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয়ই একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সফল করে তোলে
খেয়াল রাখুন
কনটেন্ট তৈরির সবচেয়ে বড় পাঠশালা হতে পারে ইউটিউব। এখানে ভিডিও তৈরি, এডিটিং এবং চ্যানেল পরিচালনা নিয়ে বিনামূল্যের টিউটোরিয়াল রয়েছে প্রচুর। তবে শুধু শেখা নয়, নিয়মিত চর্চাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
একই সঙ্গে ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য প্রিমিয়ার প্রো বা ক্যাপকাট এবং থাম্বনেল ডিজাইনের জন্য ফটোশপ বা ক্যানভার মতো সফটওয়্যার সম্পর্কে ধারণা থাকলে কনটেন্ট তৈরির কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। নিয়মিত অনুশীলন এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার মানসিকতা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দক্ষ করে তোলে।
অভিজ্ঞতার আলো
‘ডানা ভাই জোশ’ নামে বেশি পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর কামরুন নাহার ডানা মনে করেন, পেশা হিসেবে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জনপ্রিয়তা থাকলেও একে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল ক্যারিয়ার বলা কঠিন। তিনি বলেন, ‘এ পেশায় সফল হতে হলে শুধু ভালো কনটেন্ট বানালেই চলবে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কনটেন্টের ধারাবাহিকতা এবং নিজের সৃজনশীলতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’
তার মতে, এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় দক্ষতা ও কাজের ধরন নিজেকেই গড়ে তুলতে হয়। তাই শুরুতে একে খণ্ডকালীন কাজ বা শখ হিসেবে নেওয়াই ভালো। নতুনদের প্রতি ডানার পরামর্শ হলো, রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদে ভালো কাজ করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উত্তম।
ফুলটাইম কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিন আবসার কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে ‘পেশার চেয়ে বেশি একটি সৃজনশীল নেশা’ হিসেবে দেখেন। তার মতে, এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা সবসময় নিশ্চিত নয়। তাই শুধু অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে এ পথে এলে হতাশ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নিজের ভালো লাগা থেকে কাজ করার জন্য তরুণদের প্রতি পরামর্শ দেন ‘মি. আবসার’ পেজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছানো এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর। পাশাপাশি সততা, সৃজনশীলতা, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি আরও বলেন, ‘শুরুতেই অতিরিক্ত কোলাবোরেশনের দিকে না গিয়ে নিজের পরিচয় ও কাজের ধরন তৈরি করা ভালো।’






