আলো জ্বেলে যাই

অধ্যাপক ড. নাসিফ আহসান । ছবি: েলখক
আগামীকাল বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০০ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার। তালিকায় আছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. নাসিফ আহসান। তাকে নিয়ে লিখেছেন মিরাজুল ইসলাম
বড় ভাই ছিলেন জিডি পাইলট। জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিল বিমানের পাঁচ-ছয় ট্রাঙ্ক বই। সেসব বইয়ের ছবি দেখে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন বুনে দিন কাটত এক ছোট্ট ছেলের। তার কাছে বিনোদনের মাধ্যম বলতে ছিল বিটিভি। বুধবার রাত ৯টার সিরিজে যে চরিত্রই দেখানো হতো, মনে মনে সেগুলোই সাজতেন। কখনো হাইটেক ইঞ্জিনিয়ার, কখনো গোয়েন্দা। অবশ্য পেশা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ভাবনা ছিল না। তবে তাকে বদলে দিয়েছেন পরিমল ধর। কলেজজীবনে তাদের গণিত পড়াতেন। এই শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া একটি পরামর্শ পরে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। স্যার বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো বিষয় পড়া উচিত, যেটি একটি বেসিক সাবজেক্ট। কারণ, ভিত্তি শক্ত হলে সামনে অনেক পথ খোলা থাকে। ফলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও নাসিফ আহসান শেষ পর্যন্ত বেছে নেন অর্থনীতি।
তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর গবেষণার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয় তার মনে। পরে সেটিই তার ক্যারিয়ার পথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। ২০০৩ সালে অনার্স শেষ করে এর দুই বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তার শিক্ষক হয়ে ওঠার পেছনে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে চার থেকে পাঁচজন শিক্ষককে তিনি বিশেষভাবে মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তার আইডল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ জিয়াউল হায়দার। কলেজে ছিলেন ধ্যানেশ গোস্বামী। স্কুলে খুলনার সেন্ট জোসেফ স্কুলের বীরেন্দ্রনাথ রায় এবং জিলা স্কুলের রবীন্দ্রনাথ স্যার। তাদের কেউ এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাদের শেখানো বিষয় এখনো তার শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাদের কাছ থেকে তিনি শিখেছেন একজন শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষকের দায়িত্ব। তাদের একটি কথা এখনো মনে রেখেছেন, ভালো ফল করলেই হবে না; ভালো মানুষও হতে হবে। সময় মেনে চলা, নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং কোনো বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা তিনি তার শিক্ষকদের কাছ থেকেই পেয়েছেন।
পড়ানোর ক্ষেত্রে তার নিজস্ব পদ্ধতি আছে। কোনো তত্ত্ব শুধু বইয়ের পাতায় রেখে দিতে চান না; আশপাশের বাস্তবতা থেকে উদাহরণ আনেন। নগরীর গল্লামারী ব্রিজ থেকে বাজার, মোহাম্মদনগর কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনা দিয়ে অর্থনীতির তত্ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন
ড. নাসিফ আহসান মনে করেন, একজন শিক্ষক যখন কথা বলেন, তার প্রতিটি বক্তব্যের দায়িত্ব থাকে। তাই আগের মতো অনেক অনানুষ্ঠানিক কথা তিনি এখন আর বলেন না। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার আন্তরিকতা এতটুকুও কমেনি। ক্লাসে তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন। প্রথমেই বলে দেন, ‘নো কোশ্চেন ইজ আ স্টুপিড কোশ্চেন।’ যে প্রশ্ন মনে আসে, সেটি নির্দ্বিধায় করতে বলেন। পড়ানোর ক্ষেত্রে তার নিজস্ব পদ্ধতি আছে। কোনো তত্ত্ব শুধু বইয়ের পাতায় রেখে দিতে চান না; আশপাশের বাস্তবতা থেকে উদাহরণ আনেন। নগরীর গল্লামারী ব্রিজ থেকে বাজার, মোহাম্মদনগর কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনা দিয়ে অর্থনীতির তত্ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন। তার লক্ষ্য একটিই— শিক্ষার্থীরা যেন বইয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনকে মিলিয়ে দেখতে পারে।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও তিনি শেখেন। তাদের কাছে নিজেকে একজন ‘সিনিয়র গাইড’ হিসেবে দেখেন। গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারিয়ার গড়তেও সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী পরে দেশে-বিদেশে শিক্ষক হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ তাকে বলেছেন, শিক্ষক হওয়ার পেছনে তার অনুপ্রেরণা ছিল।
২০১৯ সালের ঘটনা। একদিন এক শিক্ষার্থী এসে ড. নাসিফ আহসানকে জানালেন, তিনি আর মাস্টার্সে ভর্তি হবেন না। কারণ জানতে চাইলে বললেন, আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়টি শুনে তিনি নিজ উদ্যোগে তার ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। সময়ের সঙ্গে সেই শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে প্রথম শ্রেণির একটি সম্মানজনক চাকরি পেয়েছেন। এরপর একদিন তার কাছে একটি খাম নিয়ে আসেন। ওই সাবেক শিক্ষার্থীর খামটি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা তুমি নিজের কাছে রেখে দাও। তোমার মতো যখন কারও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আর্থিক সংকট হবে, তখন তাকে সহায়তা করো।’
অত্যন্ত কৃতী ছাত্র ড. নাসিফ আহসান নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনগেন ইউনিভার্সিটিতে ২০০৮ সালে মাস্টার্স করেছেন; পড়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে। বিশেষায়ন ছিল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যান্ড ডিজাস্টার স্টাডিজ। ২০১০ সালে দেশে ফেরেন। ২০১৩ সালে জাপানে পিএইচডি করতে যান। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজে পড়াশোনা করেন। সে দেশে ছিলেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। পিএইচডির শেষ দুই মাসে তার একমাত্র ছেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। হাসপাতালে বসেই তিনি থিসিসের শেষ তিনটি অধ্যায় লিখেছিলেন। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব টোকিওতে ভিজিটিং রিসার্চার হিসেবে কাজ করেছেন। এখনো গবেষণার প্রয়োজনে জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণায়ও ব্যস্ত সময় কাটে ড. নাসিফ আহসানের। গবেষণার ক্ষেত্র উপকূলীয় জনগোষ্ঠী। এই আগ্রহের শুরু ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর। সেটির ভয়াবহতা তিনি দেখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় সেদিন রাত আড়াইটা পর্যন্ত সেই পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। পরে ত্রাণ দলের সঙ্গে শরণখোলাসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় যান। সেখানকার মানুষের জীবন দেখে তার মনে হয়, এই মানুষগুলোর জন্য কাজ করা দরকার। সেই থেকেই উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা তার গবেষণার বড় বিষয় হয়ে ওঠে। তাদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি ও তার ছাত্রছাত্রীরা। কভিডের সময় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরে তথ্য সংগ্রহে গিয়েছিল তার দল। সবাই সুরক্ষা পোশাক পরে ছিল। স্থানীয় মানুষের সন্দেহ হলো, গবেষকরা হয়তো কভিডে আক্রান্ত! ফলে কেউ তথ্য দিতে চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত সুরক্ষা সামগ্রী খুলে স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল। আইলার পর কয়রায় গবেষণার সময় স্থানীয় কয়েকজন তাদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ দিয়েছিল। কারণ তারা ভেবেছিল, গবেষকরা হয়তো ত্রাণ দিতে এসেছেন। স্থানীয় এক নেতাও ফোন করেছিলেন। তখন তাদের বলতে হয়েছিল, তারা ত্রাণ দিতে নয়; গবেষণা করতে এসেছেন।
মাঠ অভিজ্ঞতায় ড. নাসিফ আহসান মনে করেন, উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা দুর্যোগের পর বারবার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তাই শুধু দুর্যোগের সময় সহায়তা নয়, তাদের নিয়মিত আয় ও জীবিকাকে স্থিতিশীল করার উপায় খোঁজা দরকার। এখন তার গবেষণার আরেকটি লক্ষ্য স্বল্পমূল্যের আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি তৈরি করা। এমন প্রযুক্তি, যা মোবাইল ফোন বা রেডিও ব্যবহারের সামর্থ্য না থাকা মানুষকেও ঝড়ের আগে সতর্ক করতে পারবে। প্রযুক্তি হবে উন্নত, কিন্তু খরচ পড়বে কম; বার্তাও হবে স্থানীয় ভাষা বা উপভাষায়।
২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গুণী শিক্ষকদের সম্মাননার তালিকায় ড. নাসিফ আহসানের নাম এসেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে আলো জ্বেলে যাওয়া এই শিক্ষকের কাছে এমন স্বীকৃতি শুধু সম্মান নয়; নতুন দায়িত্বও। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতার সাফল্যের মূল জায়গা পদক বা স্বীকৃতি নয়। শিক্ষার্থীরা ভালো মানুষ হচ্ছে কি না, তাদের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছেন কি না, সেটিই বড়। তবে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পথে কিছু বিষয় কখনো ভুলে গেলে চলবে না। পরিবার ও মা-বাবার অবদান মনে রাখতে হবে। কঠিন সময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদেরও ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। জীবনের কোনো একটি ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত ব্যর্থতা মনে করা যাবে না। কারণ, আজকের ব্যর্থতা হয়তো আগামী দিনের অভিজ্ঞতা।




