শখ থেকে পেশা, পড়তে পড়তে ডিজাইনার

শখের বসে শেখা ডিজাইনিং পেশা হয়েছে মাহফুজুর রহমানের, ছবি: সংগ্রহ
মাহফুজুর রহমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যালেন্ডারের ডিজাইনার। প্রতি বছর ১০০ জনকে শেখাচ্ছেন ফ্রিতে। তাকে নিয়ে লিখেছেন মিরাজুল ইসলাম
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে পত্রিকার পাতায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখলেই কেটে জমাতেন মাহফুজুর রহমান। চলতি পথে রাস্তার দুপাশের বিলবোর্ডে চোখ রাখতেন। নবম শ্রেণিতে প্রথম স্মার্টফোন হাতে পেয়ে পিক্সেল ল্যাব ও পিক্সআর্টে নামি ব্র্যান্ডের বিলবোর্ড নিজের মতো করে বানাতেন; কখনো কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের নামে করতেন। স্কুলে বন্ধুদের জন্মদিনের কার্ড আর অনুষ্ঠানের নকশাও করে দিতেন শখের বশে। এসব কাজ আর কৌতূহলই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের (২০২০-২১ সেশন, ২১ ব্যাচ) এই শিক্ষার্থীকে ডিজাইনার হিসেবে তৈরি করেছে।
২০১৯ সালে পুরান ঢাকায় কবি নজরুল সরকারি কলেজে পড়ার সময় সাকরাইন উৎসবের রাতে মাহফুজ নিজের তোলা ছবিতে টাইপোগ্রাফি বসিয়ে ডিজাইন করেন। ছাত্রাবাসের ম্যানেজার হিসেবে নোটিস দেওয়ার জন্য বানিয়েছেন নোটিস প্যাড। বোর্ড পরীক্ষার আগে বোর্ডের দেওয়া সাধারণ রুটিনটি নতুন করে সাজিয়ে ব্যাচমেটদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘ছোটবেলায় আমি অন্তর্মুখী ছিলাম। একধরনের অবহেলা আর মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়েছি। খেলাধুলার সুযোগ পেতাম না। ফোনে বানানো ডিজাইন দেখে মানুষ যেদিন প্রশংসা করল, সেদিন বুঝলাম আমিও কিছু পারি। ওই প্রশংসাই আমাকে এগিয়ে দিয়েছে।’
২০২০ সালে করোনাকালে মাদারীপুরে বাড়ি ফিরে স্থানীয় ‘উদ্দীপন ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। করোনা সচেতনতার পোস্টার, ব্যানার আর নোটপ্যাড ডিজাইন করেন। চাচার নতুন খোলা স্পোর্টস শপের প্রচারণার নকশাও স্বেচ্ছায় করে দিয়েছেন। সেটি দেখে ‘কালকিনি ব্লাড ডোনেশন সোসাইটি’ তাকে সহকারী প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়। একটি মাত্র স্মার্টফোনে করা এসব কাজ ইউটিউবেও শেয়ার করতেন মাহফুজ।
২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সব নকশা তিনি সেলফোনেই করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে, ২০২২ সালের শেষ দিকে পেলেন প্রথম ল্যাপটপ। শুরুতে সহজ মনে হওয়ায় পাওয়ার পয়েন্টেই কাজ করেন। পরে ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ডের জন্য শেখেন অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার কাজ দেখে ‘রোটার্যাক্ট ক্লাব অব খুলনা ইউনিভার্সিটি’ তাকে এডিটিং টিমে নেয়। পরে তিনি ক্লাবের এডিটর ও পাবলিক ইমেজ চেয়ার হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘থটস বিহাইন্ড দ্য কেইউ’র পোস্টার আর ব্যানারও নকশা করতে থাকেন। নিজের ডিসিপ্লিনের স্পোর্টস ম্যানেজারের পক্ষে নোটিস ও ব্যানার ডিজাইন করতে গিয়ে শিক্ষক ও সিনিয়রদের নজরে আসেন। এরপর ডিসিপ্লিনের সব ইভেন্টের প্রচারণা-ডিজাইনের দায়িত্ব আসে তার কাঁধে।
স্থাপত্যে পড়ার চাপ, রাত জাগা, তার মধ্যে ল্যাপটপে ডিজাইন— সময়টা অবশ্য সহজ ছিল না। মাহফুজ বললেন, ‘দ্বিতীয় বর্ষে একদিন স্টুডিওতে ডিজাইনের কাজ করায় ক্লাসে স্যারের বকা খেলাম। মন খারাপ করে বেরিয়ে দেখি, ক্যাম্পাসের ভবনে আমার তৈরি নকশা ঝুলছে। তখন মনে হলো, অন্তত কিছু তো বানাতে পেরেছি!’
ব্যর্থতাও এসেছে তার জীবনে। ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডার ডিজাইন প্রতিযোগিতায় জমা দিয়েও নির্বাচিত হয়নি তার নকশা। তিনি বললেন, ‘এ ঘটনায় খুব হতাশ হয়েছিলাম; কিন্তু থেমে যাইনি। পরের বছর আবার জমা দিলাম। এবার আমার কাজ চূড়ান্তভাবে গৃহীত হলো।’ সেটিই ২০২৫ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডার হিসেবে প্রকাশিত হয়। একই বছর তিনি ন্যাশনাল এআই আর্ট-আ-থনের ফাইনালিস্ট হন। ইউএনডিপি, মাইক্রোসফট ও আইসিটি ডিভিশনের আয়োজনে বাংলাদেশে প্রথমবার জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এআইভিত্তিক ডিজাইন প্রতিযোগিতা এটি।
দ্বিতীয় বর্ষের শেষ পর্যন্ত তিনি টাকার কথা ভাবেননি; মনোযোগ ছিল দক্ষতা বাড়ানোয়। সেই বছরের শেষে প্রথম পেইড কাজ পান। তৃতীয় বর্ষের শেষ থেকে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত খরচ সব নিজেই চালাচ্ছেন। এখন তিনি পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। এ বছর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশনা ও ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করে পেয়েছেন সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। অ্যালামনাইয়ের পুনর্মিলনী, চাকরি মেলা, ম্যাগাজিন এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রকাশিত বুলেটিনও তার হাতেই তৈরি।
ক্যাম্পাসে মাহফুজুর রহমানের কাজের পরিধি বিস্তৃত। ২০২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের হ্যান্ডবুক ও মীর মুগ্ধ দিবসের ব্র্যান্ডিং করেছেন। ২০২৫ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার ব্র্যান্ডিং ও প্রচারসামগ্রীর নকশা তারই করা। এর আগের বছর করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি মেলার প্রচারসামগ্রীর ডিজাইন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বার্ষিক ম্যাগাজিন এবং ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভার ব্র্যান্ডিংও তার সৃজনশীলতার সাক্ষ্য দেয়।
ক্যাম্পাসের বাইরেও ছড়িয়েছে মাহফুজের কাজ। ২০২৫ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ব্র্যান্ডিং ও প্রচারসামগ্রীর নকশা করেছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পিএইচডি থিসিসের ফটোবুক ডিজাইন করেছেন, যার বিষয় ‘বাংলাদেশের উপকূলে জলবায়ু বিপর্যয়’। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি) খুলনা চ্যাপ্টারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং ও পাবলিকেশন, যুব গবেষকদের তৃতীয় আন্তর্জাতিক পোস্টার প্রতিযোগিতার (২০২৫) প্রচারসামগ্রী, কূটনীতিবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘দ্য অ্যাম্বাসাডর’-এর অক্টোবর ২০২৫ সংখ্যা, সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি কনসালটেশনের ইনফোগ্রাফিকস (২০২৫) এবং ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড স্কিল অ্যাসেসমেন্ট ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটও তার কাজের তালিকায় আছে।
নিজের শেখা বিদ্যা মাহফুজ ছড়িয়েও দিচ্ছেন। তিন বছর ধরে প্রতি বছর ১০০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাঁচ দিনের বিনামূল্যের কর্মশালা করছেন, যেখানে শেখান ডিজাইনের মৌলিক নীতি, কালার থিওরি, টাইপোগ্রাফি ও তথ্যবিন্যাস। তাদের অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। মাহফুজ গড়ে তুলেছেন নিজের কমিউনিকেশন ডিজাইন ফার্ম ‘হায়ারার্কি কমিউনিকেশনস’। তার চোখে ফ্লাইওভার, ফুট ওভারব্রিজ আর রাস্তাঘাটের এলোমেলো বিজ্ঞাপন ‘ভিজ্যুয়াল পলিউশন’, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে খারাপ প্রভাব ফেলে। প্রচারসামগ্রীকে সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক করে তিনি শহরের সৌন্দর্য ফেরাতে চান। ডিজাইনের মাধ্যমে সেই রুচিবোধকে মানুষের কাছে সহজ করে পৌঁছে দেওয়াই তার মূল লক্ষ্য।




