বিরল উদ্ভিদের নীরব প্রহরী

বিরল উদ্ভিদের সঙ্গে ড. মো. আশরাফুজ্জামান
‘ভুঁই সোনা’ নামে একটি বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ করতে আমাকে বহুবার টাঙ্গাইলের মধুপুর বনে যেতে হয়েছে। আবার কিছু উদ্ভিদের জন্য পুরো এক বছর অপেক্ষা করেছি। কারণ, নির্দিষ্ট সময় ছাড়া গাছটির কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না— বলছিলেন ড. মো. আশরাফুজ্জামান। বছরের পর বছর এমন ধৈর্য, শ্রম আর নিরলস অভিযানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করেছেন শতাধিক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ। নিজের হাতে পরিচর্যা করেন সেগুলোর। বিরল উদ্ভিদ সংরক্ষণে অসামান্য এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি পেয়েছেন ‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৫’। তার দীর্ঘ এই সবুজ অভিযাত্রার শুরু হয়েছিল প্রায় ৪৫ বছর আগে।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. আশরাফুজ্জামান বললেন, ‘স্কুলে পড়ার সময় ফুলের গাছ খুব পছন্দ করতাম। তবে খুব বেশি গাছ চিনতাম না। গোলাপ, গন্ধরাজ আর বেলী— এই কয়েকটিই ছিল পরিচিত। ১৯৮০ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে একটি মেহগনি ও একটি ইপিল-ইপিলের চারা পাই। গাছ দুটির যত্ন নিতে নিতে দেখলাম, নতুন পাতা বের হচ্ছে; গাছ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সেই আনন্দেই গাছের প্রতি আমার ভালোবাসার শুরু।’
একসময় এই ভালোবাসা দায়িত্ববোধে রূপ নেয়। দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের অবহেলায় দেশীয় বহু উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে। একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে উপলব্ধি করেন তিনি, এখনই এগুলো সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এসব উদ্ভিদ শুধু বইয়ের পাতায় দেখবে। সেই উপলব্ধিই তাকে বিরল ও বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত বিভিন্ন উদ্ভিদের ছবি, পরিচিতি ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষকে দেশীয় উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচিত করেছেন
এই কাজ কখনোই গবেষণাগারের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিরল উদ্ভিদের সন্ধানে তিনি ছুটেছেন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল, সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, টাঙ্গুয়ার হাওর, মধুপুর শালবন থেকে শুরু করে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য পর্যন্ত। জলজ উদ্ভিদের খোঁজে গেছেন বাইক্কা বিল, কেইলা বিল, সিধলং বিল, কালিয়ান বিল, বেলাই বিল ও চেচুয়া বিলেও। দুর্গম পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণ— কোনোটিই তাকে থামাতে পারেনি।
এই পথের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়। অনেক বিরল উদ্ভিদ বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন ছাড়া আর দেখা যায় না, বিশেষ করে আদাজাতীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ফুল ঝরে গেলে পুরো গাছই মাটির ওপরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে সময়ের সামান্য ভুলেও একটি অভিযান ব্যর্থ হতে পারে। উদ্ভিদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ড. মো. আশরাফুজ্জামান বললেন, আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে বিরল প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করে প্রথমে আমার বাসায় নিয়ে আসি। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেই পরিচর্যা করি। যখন গাছগুলো টিকে থাকার মতো সক্ষমতা অর্জন করে, তখন সেগুলো বোটানিক্যাল গার্ডেন ও কৃষি জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দিই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার বাসাতেই রয়েছে চার শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ। এর মধ্যে প্রায় একশ প্রজাতি অত্যন্ত বিরল ও বিপন্ন। এমন কিছু উদ্ভিদও রয়েছে, যা হয়তো বর্তমানে দেশের আর কারও সংগ্রহে নেই। কোনো বিশেষ প্রজাতির সংখ্যা বাড়লে তিনি সেগুলোর চারা গবেষক, শিক্ষার্থী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিতরণ করেন। তার বিশ্বাস, একটি বিরল উদ্ভিদকে শুধু একটি জায়গায় আটকে রাখলে সংরক্ষণ নিশ্চিত হয় না; বরং যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, বিলুপ্তির ঝুঁকি তত কমবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. আশরাফুজ্জামান শুধু উদ্ভিদ সংরক্ষণই করেননি; সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজও করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত বিভিন্ন উদ্ভিদের ছবি, পরিচিতি ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষকে দেশীয় উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচিত করেছেন। তার এই উদ্যোগে গবেষক, শিক্ষার্থী এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেন নতুনভাবে পরিচিতি পেয়েছে। দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য সাময়িকীতে তার ১২০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার কাছে গবেষণাপত্রের সংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিরল উদ্ভিদের বেঁচে থাকা। কারণ তার বিশ্বাস, একটি উদ্ভিদ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি গাছের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ওষুধের উৎস এবং কৃষির জন্য মূল্যবান জিনগত সম্পদ।




