সঙ্গী হয়ে পাশে

ড. বাহানুর রহমান। ছবি: লেখক
মাস্টার্স শেষ করে একজন শিক্ষার্থী এলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমানের কাছে। ছাত্রটির বাবা পান বিক্রি করতেন। করোনার সময় দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারে নেমে আসে চরম অভাব। অনেক দিন খাবারও জুটত না। চাকরির জন্য শিক্ষকের কাছে সহযোগিতা চাইলেন। ড. বাহানুর তাকে আশ্বস্ত করলেন। একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থাও করে দিলেন। পাশাপাশি ভালো গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য জোগালেন উৎসাহ। সেই ছাত্র এখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। এমনই আলোর দিশারী ড. বাহানুর রহমান, যিনি শ্রেণিকক্ষে আটকে থাকেন না; বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকেও ডানা মেলাতে শেখান।
১৯৮৭ সালে বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদ থেকে স্নাতক এবং ১৯৯১ সালে মাইক্রোবায়োলজি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ড. বাহানুর। একই বছর বাকৃবিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। জাপান থেকে পিএইচডি এবং তাইওয়ান ও জার্মানিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। ২০০৫ সালে অধ্যাপক হন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়াকেও নিজের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিয়েছেন।
শ্রেণিকক্ষে তার শিক্ষাদান কৌশল কিছুটা ভিন্ন। ক্লাসের প্রথম তিন-চার মিনিট পাঠ্যবই পড়ান না। এ সময় জীবনের কথা বলেন। শিক্ষার্থীদের সময়ের মূল্য ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব বোঝান। মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব মনে করিয়ে দেন। একই সঙ্গে দেশের জনগণের টাকায় চলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের দায়বদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। তার কাছে একজন ভালো গ্র্যাজুয়েটের মতো ভালো মানুষ হয়ে ওঠার উৎসাহ দেওয়াও পাঠদানের অংশ। এরপর শুরু করেন মূল পাঠদান। গতানুগতিক স্ক্রিপ্ট অনুসরণের বদলে নিজে পড়াশোনা করে বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আজকের ক্লাস কত শতাংশ বুঝেছ?’ ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী বুঝতে পারলেই সন্তুষ্ট হন তিনি; অন্যথায় নয়। পরের ক্লাসে আগের পড়া কতটা বুঝেছেন তারা, সেটি যাচাই করেন এই শিক্ষক।
এতিম এক ছাত্রী তার কাছে মাস্টার্স করার আগ্রহ জানিয়ে বলেছিলেন, পড়ালেখা শেষ হলে যেন একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। বাবা মারা যাওয়ার পর চাচাতো ভাই তার ও তার মায়ের খরচ বহন করছিলেন। কিন্তু মাস্টার্স শেষ হলে সেই সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ড. বাহানুর রহমান ১৯৭১ সালে বাবা হারিয়েছেন, তখন তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তাই মেয়েটির অসহায়ত্বটা অনুভব করতে পারলেন। তাকে মাস্টার্সে ভর্তি করিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে চাকরির বিষয়টি আগে জানাননি। থিসিস জমা দেওয়ার পর তাকে সেই প্রতিষ্ঠানে পাঠান। সেখানেই চাকরি হয় ছাত্রীর। পরে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতেও উৎসাহ দেন। সেই ছাত্রী এখন লাইভস্টক সেক্টরে ক্যাডার কর্মকর্তা।
আরেকজন শিক্ষার্থী তার অফিসের সামনে ঘোরাঘুরি করতেন। একদিন তিনি জানতে পারলেন, ছেলেটির ইচ্ছা তার অধীনে পিএইচডি করবেন। তিনি তাকে গবেষণার সুযোগ দেন। কিন্তু পারিবারিক ঋণের চাপে একসময় ছাত্রটির পক্ষে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ড. বাহানুর তাকে বোঝান, গবেষণার ৯০ শতাংশ কাজ শেষ; এরই মধ্যে তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তিনি চাকরির পাশাপাশি থিসিস শেষ করার পরামর্শ দেন। পরে ওই ছাত্রের চাকরির ব্যবস্থাও করেন। সেই শিক্ষার্থী এখন গবেষক হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিজের সঙ্গে রাখতে ভালোবাসেন ড. বাহানুর। ছুটির দিনেও কখনো ল্যাবে, কখনো মাঠে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, ভ্যাকসিন ও প্রোবায়োটিক নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি হাঁসের ডাক প্লেগ নিয়েও কাজ চলছে তার। ড. বাহানুরের গবেষণায় তৈরি কিছু ভ্যাকসিন সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। তার গবেষণার লক্ষ্য কৃষক ও প্রাণিসম্পদ খাতের উপকার করা।
শিক্ষার্থীদের গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ২০০২ সাল থেকে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন রাত ১০টা, এমনকি ১২টা পর্যন্তও সেখানে শিক্ষার্থীরা গবেষণা করেন। একবার এডিবির একটি দল ল্যাব পরিদর্শনে এসে দুপুর দেড়টার দিকে ১৯ শিক্ষার্থীকে গবেষণায় ব্যস্ত দেখতে পায়। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন তারা। মন্তব্য করেন, ‘আমরা এমন বিশ্ববিদ্যালয়ই দেখতে চাই।’
শিক্ষার্থীদের প্রতি তার এই দায়িত্ববোধ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরও বহাল থাকে। তিনি শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের দিকেই তাকান না; কেউ খারাপ করলে সেই কারণও খোঁজেন। কোথায় সমস্যা হলো, জানার চেষ্টা করেন। ছাত্রটি ক্লাসে কেন অনুপস্থিত ছিল, সে বিষয়ে খোঁজ নেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ভেটেরিনারি অনুষদের বৃত্তি তহবিল থেকে প্রতি বছর ৪০-৫০ জনকে সহায়তা করেন। গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমেও পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমান এখন ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন। এই দায়িত্ব নেওয়ার পর চালু করেছেন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপ ও এক্সটার্নশিপ উদ্যোগটি। তার প্রচেষ্টায় গত দুই বছরে বহু শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রযুক্তির সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক অঙ্গনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ক্যারিয়ার গড়ার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।




