মৌমাছির বন্ধু
- শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। গবেষকদের একজন কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন গবেষণা করছেন বাংলাদেশের মৌমাছি নিয়ে।

বাংলাদেশে প্রথম মৌমাছির কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন। ছবি: আশিকুর রহমান
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের মৌমাছি নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন ২০০৩ সালে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন, তখন থেকেই মৌমাছি নিয়ে তার কাজ করার আগ্রহ জন্মে, যা এখনো তাকে তাড়া করে যাচ্ছে। তিনি মৌমাছির ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তী সময়ে বেলজিয়ামের ‘ইউনিভার্সিটি অব গ্যান্ট’ ও অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন’ থেকে উচ্চতর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
মৌমাছি নিয়ে ড. সাখাওয়াৎ হোসেন প্রথম কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের ফান্ড লাভ করেন এবং মৌমাছির উৎপাদিত পদার্থগুলো উন্নত করা, সংগ্রহ করা এবং কৃষকদের তা শেখানোর জন্য কাজ করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মৌমাছির বিভিন্ন উপজাত নিয়ে গবেষণা করেন। তথ্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে যান এবং গবেষণায় মধুর উৎপাদন বৃদ্ধি ও অন্যান্য উপাদান, যেমন— মোম, পোলেন, প্রপোলিস, রয়েল জেলি, বি-ভেনম সম্পর্কে মৌচাষিদের অবগত করেন। তিনি তিন জেলায় ১০ জন করে চাষি নিয়ে প্রতি বাক্স থেকে প্রায় আধা কেজি পোলেন সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। জানালেন, যদি সব চাষিকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সহযোগিতা দেওয়া যায়, তাহলে বছরে প্রায় ৩০ টন পরাগরেণু সংগ্রহ করা সম্ভব।
পরে তিনি প্রপোলিস বা মৌ-আঠা নিয়ে কাজ করেন। মৌ-আঠার অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণাগুণ থাকায় তা ওষুধ শিল্পে টিংচার হিসেবে ঠান্ডা-কাশির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আগে চাষিরা না বুঝে এগুলো ফেলে দিতেন; কিন্তু ড. সাখাওয়াৎ হোসেনের উদ্যোগে এখন তারা এসব সংগ্রহ করে বাজারজাত করছেন। শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম উপায়ে মোমের শিট তৈরি করে মৌমাছির বাসা তৈরির কাজ সহজ করার প্রযুক্তিও তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেনের বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্যের একটি হলো বাংলাদেশে প্রথম মৌমাছির কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ গবেষণাগার ও মৌবাক্স স্থাপনের জন্য মৌ-খামার গড়ে তোলা হয়েছে। মৌচাষিদের সামনে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রদর্শন ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন তিনি। ভেজালমুক্ত শতভাগ খাঁটি মধু উৎপাদনে তিনি ‘কম্ব ক্যাসেট’ বা মৌমাছির চাক বা মধু উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের ছোট ফ্রেম বা ট্রে-যুক্ত ক্যাসেট প্রযুক্তিও তৈরি করেছেন। সেখানে মৌচাকের ভেতরেই প্রাকৃতিক মোমসহ সিলগালা অবস্থায় মধু উৎপাদিত হয়। এই কাজে পারদর্শী শাহজাহান নামে এক চাষি তাকে সামগ্রিক সাহায্য করছেন।
মোবাইল টাওয়ারের ১০০ মিটারের মধ্যে মৌবাক্স রাখা হলে রেডিয়েশনের প্রভাবে মৌমাছির গতিপথ ভুল হয়, তারা বাসায় ফিরতে সমস্যাবোধ করে এবং তাদের লার্ভা উৎপাদন কমে যায়
মৌমাছি গবেষণায় উদ্ভাবনের পাশাপাশি এর জন্য হুমকিগুলো চিহ্নিত করতেও তিনি কাজ করছেন। তার গবেষণায় মৌমাছির জন্য ক্ষতিকর ১৭টি পোকামাকড় এবং পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়েছে। এখন তার অন্যতম প্রধান গবেষণা হলো মোবাইল বা সেল টাওয়ার থেকে নির্গত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন কীভাবে মৌমাছির ওপর প্রভাব ফেলছে। তার গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল টাওয়ারের ১০০ মিটারের মধ্যে মৌবাক্স রাখা হলে রেডিয়েশনের প্রভাবে মৌমাছির গতিপথ ভুল হয়, তারা বাসায় ফিরতে সমস্যাবোধ করে এবং তাদের লার্ভা উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি কৃষিতে অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশকের ব্যবহার মৌমাছির প্রজনন ক্ষমতা কীভাবে নষ্ট করছে, সে বিষয়েও তিনি সারা দেশের চাষিদের সচেতন করছেন এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।





