হার না মানা সোলায়মান

নিজের আম বাগানে মোহাম্মদ সোলায়মান। ছবি: শেখ আব্দুল হান্নান
পেশায় ছিলেন সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এখন পুরোদস্তুর খামারি। সোনাগাজীতে মেজর (অব.) মোহাম্মদ সোলায়মানের সোয়াশ অ্যাগ্রো ঘুরে এসে লিখেছেন আসাদুজ্জামান দারা
শৈশবে বাবার সঙ্গে ফসলের মাঠে যেতেন মোহাম্মদ সোলায়মান। বাবা জমিতে কাজ করতেন, তিনি পাশে দাঁড়িয়ে দেখতেন। তখন ফসল বলতে মূলত ধানই চিনতেন। বাতাসে সবুজ আর আধপাকা ধানের শিষ দুলত। সেই দৃশ্য দেখলেই ছোট্ট সোলায়মানের মন ভরে যেত। বাবা বেশি দিন বাঁচেননি। কৃষকের সংসারে বড় হয়ে ওঠা সেই ছেলেটিকে এরপর মন দিতে হয় পড়াশোনায়। ১৯৬৮ সালে ভর্তি হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। দুই বছর পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নির্বাচিত হয়ে যোগ দেন ৪৭তম বিএমএ লং কোর্সে। এরপর এলো একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধে গেলেন। ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় নামেন সোলায়মান। সরকারি বাড়িঘর নির্মাণের কাজ। কিন্তু ঠিকাদারি তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
তার ভাষায়, ‘ঠিকাদারি করতে গিয়ে অনেক সময় আপস করতে হয়, এমনকি মিথ্যা বলতেও হয়।’ এসব তার স্বভাবের সঙ্গে মিলছিল না। ফলে যে ব্যবসা দাঁড় করাতে সময় ও অর্থ ব্যয় করেছিলেন, সেটিই একসময় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর রাজধানীর মালিবাগে শুরু করলেন তৈরি পোশাকের ব্যবসা। জার্মানি ও ফ্রান্সে বিভিন্ন উৎসবের পোশাক সরবরাহ করত প্রতিষ্ঠানটি। একসময় ব্যবসা ভালো চললেও পরে টানা লোকসানে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেটিও বন্ধ করে দিতে হয়। দুই দফা ব্যবসায়িক ব্যর্থতার পর সোলায়মান ফিরে এলেন নিজের শিকড় সোনাগাজীতে। তখনই পুরনো সেই মাঠের স্মৃতি আবার সামনে এসে দাঁড়াল। কৃষির প্রতি টান ভেতরে আগে থেকেই ছিল। এবার তাই নিয়েই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কৃষিকে নিলেন শেখার বিষয় হিসেবে।
বিভিন্ন কৃষি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শক হিসেবেও যুক্ত আছেন তিনি। তবে নিজেকে কৃষক ভাবতেই ভালোবাসেন সোলায়মান
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন। যে বিষয়ে যিনি দক্ষ, তার কাছে গিয়ে শিখলেন সেই বিষয়। কৃষির নানা দিক সম্পর্কে জ্ঞান নেওয়ার চেষ্টা করলেন। এরপর সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের সোনাপুর এলাকায় নানার বাড়িতে এলেন। সেখানেই কৃষি খামার গড়ার কাজ শুরু। প্রথমে কিনলেন ৬ একর ৪০ শতক জমি। এরপর ধীরে ধীরে জমি বাড়াতে থাকলেন। কোনো জমি কিনলেন, কোনো জমি বর্গা বা ইজারা নিলেন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। ছোট সেই উদ্যোগ আজ দাঁড়িয়েছে ৬৫ একরের বিশাল খামারে। প্রতিষ্ঠানের নাম সোয়াশ অ্যাগ্রো।
সোলায়মান জানালেন, সোয়াশ অ্যাগ্রোতে এখন ১০২ জাতের প্রায় ৬ হাজার আমগাছ। শুধু রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম নয়, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের আমের জাতও রয়েছে এখানে। নারিকেল, সুপারি, পেঁপে, কাঁঠাল, জাম, সফেদাসহ নানা ফলের গাছ রয়েছে। কয়েকটি পুকুরে মাছ চাষ হয়। পালন করা হয় গরু-ছাগল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বারি-১১ জাতের আমের চারা বড় আকারে উৎপাদন শুরু করেন তিনি। সোলায়মানের দাবি, তার খামার থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বারি-১১।
খামারে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। বৃহত্তর নোয়াখালী ছাড়াও কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা দর্শনার্থীরা আসেন। কেউ আসেন শেখার জন্য, কেউ শুধু দেখতে।
খামারে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪০ জন কাজ করছেন। একবার কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান নির্মাতারা শাইখ সিরাজ এসে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।
সোলায়মান তার অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেন। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন চাষপদ্ধতি নিয়ে। তার বিশ্বাস, কৃষি থেকে শুধু নিজের আয় নয়, অন্যের কর্মসংস্থানও তৈরি করা সম্ভব। কৃষকদের কাছে আমের নতুন জাত ও চাষের পদ্ধতি পৌঁছে দিতে পারাকেই নিজের সাফল্য হিসেবে দেখেন সোলায়মান। তার ভাষায়, ‘কৃষি আমাদের প্রাণ। সবাইকে কৃষির কাছে আসতে হবে।’
বেশিরভাগ সময়ই খামারে থাকেন তিনি। একসময় যে মানুষটি ঠিকাদারি ব্যবসার যন্ত্রপাতি সের দরে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, যে মানুষটি পোশাক কারখানার লোকসানে পড়ে সোনাগাজীতে ফিরে এসেছিলেন, সেই মানুষটিই আজ কৃষি খামার গড়ে তুলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
স্ত্রী দিলরুবাইয়া সোলায়মান, তিন ছেলে সাজিদ বিন সোলায়মান, ওমর বিন সোলায়মান ও শাকের বিন সোলায়মান এবং মেয়ে আয়শা বিনতে সোলায়মান নিয়ে তার পরিবার। পরিবারের সদস্যরা সবসময় তাকে উৎসাহ দেন বলেই জানালেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন কৃষি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শক হিসেবেও যুক্ত আছেন। তবে নিজেকে কৃষক ভাবতেই ভালোবাসেন সোলায়মান।
আলাপের শেষে বললেন, ‘যতদিন বাঁচব, কৃষির সঙ্গে বাঁচতে চাই। যেখানে যাই, বাগানে ফিরে না এলে মনটা ভালো থাকে না।’



