গানের জানালায় গোলাম মোর্শেদ

লাকী আখান্দের সঙ্গে গীতিকার গোলাম মোর্শেদ
ছিলেন পুরোদস্তুর গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। ওটাই ছিল তার পরিচয়। ঘটনাক্রমে হয়ে গেলেন গীতিকবি। তাতেও সফল। গোলাম মোর্শেদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
গানের জগতে আসার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না গোলাম মোর্শেদের। গান লিখবেন— এমন চিন্তাও কখনো করেননি। কবিতা ভালোবাসতেন, কখনো গভীর রাতে নিজের মতো করে লিখতেনও। কিন্তু সকালে উঠে সেসব লেখা দেখে মনে হতো, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বেরোতেই পারেনি! রাগ করে ছিঁড়ে ফেলতেন। আবার রাতে লিখতেন।
গান শেষ পর্যন্ত তার কাছে এসেছে অন্য জানালা দিয়ে। সেই জানালার নাম লাকী আখান্দ।
লাকী আখান্দের তোড়জোড়েই একদিন গান লেখা শুরু করলেন গোলাম মোর্শেদ। ১৯৯৭-৯৮ সালের কথা। নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন লাকী। ডেকে বললেন, ‘মাশু (গোলাম মোর্শেদের ডাকনাম) আমি আবার গান করব। তুমি গান লেখো।’ অবাক হয়ে গোলাম মোর্শেদ বলেছিলেন, ‘আমি গান লিখব? কী বলেন?’ লাকী বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, তুমিই লিখবে।’ এভাবেই জন্ম তার প্রথম গান, ‘ভালোবেসে ভুল ছিল যত’।
আজ তিন দশক ধরে গান লিখছেন গোলাম মোর্শেদ। তার লেখা গান গেয়েছেন জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরীসহ জনপ্রিয় শিল্পীরা। কিন্তু তার নিজের কথাতেই, তিনি কখনো গীতিকার হতে চাননি; বরং জীবন তাকে গীতিকবিতার কাছে নিয়ে এসেছে।
দেখেছেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, নব্বই ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন। আর সেই জীবনের অন্য প্রান্তে আছে গান। তার গানের কথা এলেই আসে কবিতা কথা।
একবার তো তার এক প্যারোডি গানের কারণে বিয়ে ভাঙার জোগাড়। তখন কেইবা জানত, গায়ে হলুদের গান লেখা মাশু একদিন গীতিকবি বনে যাবেন?
গোলাম মোর্শেদের কবিতার সঙ্গে পরিচয়ের শুরুটা খুব ছোটবেলায়। বাবা কবিতা ভালোবাসতেন। অবসরে ছেলেকে বুকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন।
যখন একটু বড় হলেন, হাতে এলো জীবনানন্দের কবিতা। গোলাম মোর্শেদের ভাষায়, ‘যখন জীবনানন্দের কবিতা পড়া শুরু করলাম, আমার মাথা ঘুরে গেল। তখন আমি বাংলাকে আবিষ্কার করলাম।’
জীবনানন্দ তাকে নাড়া দিয়েছিলেন ভীষণভাবে। জীবনানন্দের কবিতার ভাষা তার লেখার জগতেও পরিবর্তন এনেছিল। তবে গীতিকার হওয়ার ইচ্ছাটা তখনো জাগেনি।
শৈশবে ভালো ছাত্র ছিলেন। স্কুলজীবনে ভালো ফল করতেন। ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ডও করেছিলেন।
কিন্তু ইন্টারমিডিয়েটে এসে তার মনে হলো, এমন ‘সিরিয়াস ভালো ছাত্র ধরনের’ জীবন তিনি চান না। একসময় পরীক্ষাই দেবেন না বলে ঠিক করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ফল হলো দ্বিতীয় শ্রেণি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। পড়লেন ম্যানেজমেন্টে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোও অ্যাকাডেমিক জীবনের মধ্যে আটকে ছিল না। প্রায়ই মুহসীন হলে থাকতেন। ভূতের গলি, গ্রিন রোড, বন্ধুদের বাসা— এসব ছিল আড্ডার জায়গা। এ সময়ই ঘনিষ্ঠতা লাকী আখান্দের সঙ্গে। একসময় ফুরিয়ে এলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। এখন কী করবেন? বড় পরিবার। পাঁচ ভাই, এক বোন, মা-বাবা। চাকরি করে সংসার চালানো কঠিন। শুরু করলেন মাছ রপ্তানির ব্যবসা। ফ্রোজেন ফিশ যেত সিঙ্গাপুর, হংকংয়ে। এই জীবনে তাহলে গান এলো কোন ফাঁক দিয়ে?
ছাত্রজীবনে বন্ধুদের আত্মীয়স্বজনের বিয়েতে প্যারোডি গান লিখে দিতেন গোলাম মোর্শেদ। একবার তো তার এক প্যারোডি গানের কারণে বিয়ে ভাঙার জোগাড়। তখন কেইবা জানত, গায়ে হলুদের গান লেখা মাশু একদিন গীতিকবি বনে যাবেন? আসলে কবিতার প্রতি তার প্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সংস্কৃতি চর্চা তাকে সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
জীবনের শুভ্রতা যেমন দেখেছেন, ভয়াবহতাও দেখেছেন। তার গানে কোথাও না কোথাও এসব অভিজ্ঞতা মিশে গেছে।
প্রথম গান লেখার পর লাকী আখান্দের উৎসাহেই শুরু করলেন মিক্সড অ্যালবামের কাজ। তিনি গান লিখলেন আর সুর করলেন লাকী আখন্দ। অ্যালবামের নাম ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’। ইজাজ খান স্বপন অ্যালবামের শিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজটি করছিলেন। এই অ্যালবামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গোলাম মোর্শেদের জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি স্মৃতি। একদিন ইজাজ খান স্বপন তাকে নিয়ে গেলেন জেমসের উত্তরার বাসায়। সঙ্গে চার-পাঁচটি গানের ডেমো। জেমস প্রথমেই জানতে চাইলেন, তিনি কী কারণে গান লিখতে বসেছেন?
গোলাম মোর্শেদ মিটিমিটি হেসে চুপ করে ছিলেন। কিছু বললেন না। এই সুযোগে ইজাজ খান স্বপন ডেমো গানগুলো বাজিয়ে শোনাতে লাগল।
একপর্যায়ে এলো ‘লিখতে পারি না কোনো গান’। জেমস সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এই স্বপন থামো! এই গানটা গাব।’ তারপর আরও একটি গান শুনলেন ‘ভালোবেসে চলে যেও না’। সেটিও পছন্দ হলো। জেমস বললেন, ‘এই দুইটা গান গাব, আর কোনো গানই শোনার দরকার নাই।’ পরে দুটো গানই হলো সুপার হিট।
এ মাসের ২৫ তারিখ গোলাম মোর্শেদ ৭০ ছোঁবেন। আজও গান নিয়েই আছেন। ‘গান জানালা’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন নতুন ও পুরনো গান ধরে রাখার একটা জায়গা হিসেবে। তরুণ শিল্পীদের খুঁজে বের করার কাজটিও করে যাচ্ছেন। তরুণদের সুযোগ করে দিচ্ছেন এই প্ল্যাটফর্মে। কারণ তার মনে হয়েছে, সম্ভাবনয়াময় শিল্পীদের অনেকেই যেমন হারিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি অনেক ভালো গানও হারিয়ে যাচ্ছে।
নতুনদের নিয়েও তার অপার আগ্রহ। যারা ভালো গায়, ভালো লেখে এমন তরুণদের খুঁজে বের করতে তার ভালো লাগে। ‘গান জানালার’ মাধ্যমে সে কাজটিও করে যাচ্ছেন।




