মনের খেয়াল
যন্ত্রণার নাম গ্যাসলাইটিং

মডেল: অ্যাঞ্জেলা ডি’কস্টা। সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
কাছের মানুষ কোনো সমস্যাকে যদি সমাধানের দিকে না টেনে কৌশলে আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে যাতনা চরমে পৌঁছাতে পারে। লিখেছেন নাহিদ ইসলাম
সেদিন রফিক সাহেব হুট করেই খেয়াল করলেন, তার চশমাটা যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। ড্রয়ারে হাতড়ালেন, খাটের নিচে উঁকি দিলেন— কোথাও নেই। স্ত্রী নীলু এসে খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘চশমা তো তুমি রান্নাঘরের জানালার পাশে রেখে এসেছ, ভুলে গেলে?’ রফিক সাহেব অবাক হলেন। তার স্পষ্ট মনে পড়ছে, তিনি রান্নাঘরে যাননি। কিন্তু নীলু যখন চোখের দিকে তাকিয়ে মায়ামাখা গলায় বারবার বললেন, ‘তুমি আজকাল বড্ড ভুলে যাচ্ছ, একটা ডাক্তার দেখানো দরকার,’ তখন রফিক সাহেব নিজের স্মৃতিশক্তির ওপরই সন্দেহ করতে শুরু করলেন। অথচ আদতে চশমাটা নীলুই ওখানে সরিয়ে রেখেছিলেন!
রফিক-নীলু দম্পতির এ ঘটনা কাল্পনিক হলেও বাস্তবে আমরা অহরহ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যেখানে খুব আপন কেউ আমাদের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ভ্রান্তির জাল বোনে। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই নিঃশব্দ কিন্তু ভয়ংকর নির্যাতনের নাম গ্যাসলাইটিং। এটি শুধু স্রেফ এক-আধটা মিথ্যা বলা নয়; বরং তিলে তিলে একজনের আত্মবিশ্বাস খুঁড়ে বের করে আনার এক সুনিপুণ কূটকৌশল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাইসুল ইসলাম পরাগের মতে, গ্যাসলাইটিং কোনো সাধারণ ঝগড়া নয়; এটি একধরনের ইমোশনাল অ্যাবিউজ। একজন গ্যাসলাইটার তার শিকারকে এমনভাবে কোণঠাসা করে ফেলেন, যার ফলে ভিকটিম একসময় নিজের অস্তিত্বের বিষয়ে আস্থা হারিয়ে পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই প্রক্রিয়ায় অপরাধী চান তার শিকারের চিন্তা করার ক্ষমতাটুকু কেড়ে নিতে। ফলে ভিকটিম নিজের দেখা বা শোনা বিষয়গুলো ভুল বা ভ্রম ভাবেন। বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছড়িয়ে আছে অফিসের কিউবিকল থেকে শুরু করে পারিবারিক আড্ডার ড্রয়িংরুম পর্যন্ত।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান বা নিউ ইয়র্কারের মতো বিশ্বখ্যাত সাময়িকীগুলো বলছে, এটি মূলত একধরনের অসম ক্ষমতার খেলা। যখন কোনো বস তার অধস্তন কর্মীকে বলেন যে তার মাথায় বুদ্ধি কম; কিংবা কোনো বন্ধু যখন অন্য বন্ধুর আবেগ নিয়ে মজা করে পরে তাকেই ওভার-সেনসিটিভ বা পাগলের তকমা দেন, তখন বুঝতে হবে সেখানে গ্যাসলাইটিংয়ের বিষ ছড়াচ্ছে। এটি কখনো কখনো সামাজিক রূপও নেয়। কোনো বিশেষ এলাকা বা পেশার মানুষের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে যখন বলা হয়, ‘তোমাদের বুদ্ধিই এমন’— তখন ভিকটিম প্রতিবাদ করলে তাকেই ‘রসিকতা না বোঝা মানুষ’ হিসেবে সমাজচ্যুত করার চেষ্টা চলে। গ্যাসলাইটিং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভেতর থেকে একা করে দেয়।
গ্যাসলাইটাররা সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক স্বভাবের হন। তারা অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ভালোবাসেন। ডা. পরাগ মনে করেন, যারা ছোটবেলায় কোনো ধরনের শোষণের শিকার হয়েছেন কিংবা যাদের মধ্যে চরম হীনম্মন্যতা কাজ করে, তারা বড় হয়ে অন্যের ওপর এমন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালান। মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় গ্যাসলাইটার নিজেও জানেন না তিনি এই কাজ করছেন। তিনি হয়তো অবচেতন মনে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতেই সত্যকে বিকৃত করে অন্যের সামনে পেশ করেন। এর ফলে ভিকটিমের মনে একধরনের অনিশ্চয়তার কুয়াশা তৈরি হয়। বুঝতে পারেন না, তিনি ভুল নাকি জগৎ জুড়েই বিভ্রান্তি ছড়ানো। এই দোলাচল তাকে বিষণ্ণতা বা চরম মানসিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।
দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, এই নিপীড়নের চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি করে প্রকৃত ঘটনাকে অস্বীকার করার বিষয়টি। অর্থাৎ আপনাকে কেউ আঘাত করল, অথচ পরে সে বুক ফুলিয়ে অস্বীকার করল যে এমন কিছু ঘটেইনি; এই অস্বীকৃতিই আক্রান্ত ব্যক্তিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। তবে এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথও বাতলে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. পরাগ পরামর্শ দেন, যখনই মনে হবে আপনার সঙ্গে এমনটা ঘটছে, তখনই নিজের ওপর আস্থা রাখা শুরু করুন। আপনি যদি নিশ্চিত হন, নিজে যা দেখেছেন বা শুনেছেন তা সত্যি, তবে অন্য কেউ তা অস্বীকার করলেই আপনার অভিজ্ঞতা মিথ্যা হয়ে যায় না। নিজের দেখা সত্যকে ডায়েরিতে লিখে রাখা কিংবা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে শেয়ার করা হতে পারে মুক্তির একটি বড় উপায়। এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, আপনার স্মৃতি ঠিক ছিল।
সবশেষে বলা দরকার, মুক্তি কোনো সম্পর্ক ছিন্ন করার মধ্যে নয়; বরং নিজের হারানো কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার মধ্যে। গ্যাসলাইটার কখনোই ভুল স্বীকার করবেন না, তাই তার কাছ থেকে ‘দুঃখিত’ শব্দটা শোনার আশায় সময় নষ্ট করা মানে নিজেকে আরও ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া। তার চেয়ে চারপাশে অদৃশ্য সীমারেখা টেনে দেওয়া ভালো। কেউ যদি ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আপনার বাস্তবতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়, তবে তাকে স্পষ্ট করে ‘না’ বলা শিখতে হবে। নিজের পৃথিবীটা নিজ চোখ দিয়ে দেখাই প্রকৃত স্বাধীনতা। অন্য কারও ছক কাটা চিত্রনাট্যে নিজের জীবনকে অভিনীত হতে দেবেন না।




