টোটো কোম্পানি
পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী

দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ ‘মিনি কাশ্মীর’
এবারের যাত্রায় আমরা ছিলাম মাত্র দুজন, আমি আর আমার প্রিয় বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন রাহুল। ভ্রমণ শুরু হয় পৈতৃক ভিটা কক্সবাজারের রামু চা বাগান থেকে। কক্সবাজারের ৬ নম্বর লঞ্চঘাট থেকে স্পিডবোটে রওনা দিলাম বাঁকখালীর বুক চিরে মহেশখালীর পানে। কূল ঘেঁষে কাদামাটির ওপর ম্যানগ্রোভ বনভূমির ছোট ছোট গাছ, শ্বাসমূল নজর কাড়ল শুরুতেই। চ্যানেলের ছোট ছোট ঢেউয়ের তালে তালে ১৫ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। মহেশখালী জেটিতে যখন পা রাখলাম, দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেওড়াগাছের সারি স্বাগত জানাল।
জেটি পার হয়ে আমরা একটি ছোট্ট স্টেশনে পৌঁছাই। বাঁশের তৈরি চাটাই বা মাচায় সারি সারি সাজানো রয়েছে বিভিন্ন আকারের লইট্টা, ফাইস্যা আর ছুরি মাছ। শুঁটকিপল্লী দেখা শেষে একটি অটোরিকশা নিয়ে সোজা চলে এলাম দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ ‘মিনি কাশ্মীরে’। মহেশখালী উপজেলার ডেইলপাড়ায় এর অবস্থান। আমাদের দেশে নতুন কোনো দর্শনীয় স্থান গড়ে উঠলেই কেন যেন সেগুলোর নাম বিদেশি কোনো স্থানের অনুকরণে দেওয়া হয়! দ্বীপের বুকে ছোট ছোট পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা সবুজ উদ্ভিদগুলোকে স্থানীয়রা ‘ছন’ বলেই চেনেন। অতীতে গ্রামবাংলার অধিকাংশ মাটির ঘর বা বাঁশের ঘরের চাল বা ছাউনি তৈরিতে প্রধান উপাদান হিসেবে এই ছন ব্যবহার করা হতো। এখানে এত বড় পরিসরে ছনের চাষ দেখে বেশ অবাক হতে হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এই ছনগুলো মূলত মহেশখালীর বিখ্যাত পানের বরজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই চাষ করা হয়।
মহেশখালী মানেই যেমন পাহাড়, তেমনি এর আরেকটি বড় পরিচয় মিষ্টিপানের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি। এখানকার এই বিখ্যাত মিষ্টিপানগুলো সবুজ পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষেই চাষ করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা শখ করে এই পান খাওয়ার জন্য ছুটে আসেন। আমাদের পরের গন্তব্য আদিনাথ মন্দির। মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এ মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। এই মন্দিরে পৌঁছাতে আমাদের গুনতে হলো অনেকগুলো সিঁড়ি। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে এখানে যে ঐতিহ্যবাহী মেলা বসে, তখন জমজমাট হয়ে ওঠে গোটা দ্বীপ।
মহেশখালী মানেই যেমন পাহাড়, তেমনি আরেকটি বড় পরিচয় মিষ্টিপানের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি
মন্দিরের সামনে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ নানা ধরনের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এখানকার কাপড়ের দোকানগুলোতে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী কাপড়, ধুতি, লুঙ্গি, শাল ও শার্ট বিক্রি করা হয়। দোকানগুলোর বেশিরভাগ চালিকাশক্তি হলেন নারী। এই নারীদের অমায়িক ব্যবহার যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। আমার বন্ধু সাজ্জাদ শখ করে একটি চমৎকার লুঙ্গি ও একটি রাখাইন শার্ট কিনে নেয়।
মন্দির প্রাঙ্গণ ঘুরে আমরা মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল ‘চরপাড়া-ঝাউবাগান’-এর উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথে একটি ছোট্ট বাজারের ভাতের হোটেলে মাছ আর মুরগির মাংস দিয়ে মাত্র ১০০ টাকায় অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে আমরা দুপুরের খাবার শেষ করলাম। এরপর ঝাউবাগানে পৌঁছাতেই আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিল একটি দৃষ্টিনন্দন খেলার মাঠ। সেটা পেরিয়ে একটু এগোতেই দেখা মিলল দীর্ঘ ঝাউগাছের সারি, যার ফাঁক দিয়ে অস্তগামী সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহূর্তে আমরা বাড়ির পথে ফেরার প্রস্তুতি নিলাম।
জেটিতে এসেই দেখতে পেলাম কক্সবাজার থেকে মহেশখালীর উদ্দেশে ছেড়ে আসা একমাত্র লঞ্চটি যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। টিকিট কেটে আমরা উঠে পড়লাম লঞ্চের একদম ওপরের তলায়, অর্থাৎ তিনতলায়। তখন চারপাশের আলো ম্লান হয়ে ধীরে ধীরে সূর্য অস্ত যেতে শুরু করেছে। আমাদের লঞ্চটিও নদী বেয়ে মোহনা পেরিয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল। মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরসংলগ্ন পাহাড়গুলোর সারি এবং বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী খুরুশকুল বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা দূর থেকে দেখতে লাগছিল এককথায় অসাধারণ। লঞ্চের ছাদ থেকে সাগরে সূর্যের হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং এই বিশাল উইন্ড টারবাইনগুলোর ঘূর্ণন দেখে মনে হলো, আমাদের আজকের এ ভ্রমণ সার্থক।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে করে সরাসরি কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে। কক্সবাজার শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে অটোরিকশা বা রিকশায় চেপে আপনাকে চলে আসতে হবে ৬ নম্বর ঘাটে। ঘাট থেকে মহেশখালীতে যাওয়ার জন্য দুটি মাধ্যম রয়েছে।
স্পিডবোটে সময় কম লাগে, মাত্র ১৫ মিনিট। প্রতিজন ভাড়া সাধারণত ১১০-১২০ টাকার মতো হয়ে থাকে। একটু সময় নিয়ে সাগরের স্নিগ্ধ হাওয়া উপভোগ করতে করতে যেতে চাইলে ৩০-৪০ টাকা ভাড়ায় লঞ্চে চড়ে সরাসরি মহেশখালী জেটিতে পৌঁছাতে পারবেন।
মহেশখালী জেটিতে নামার পরই অটোরিকশা বা মাহিন্দ্রা রিজার্ভ করে দর্শনীয় স্থানগুলো সহজে ঘুরে দেখতে পারবেন।





