টোটো কোম্পানী
ঢাকার কাছে বেলাই বিল

গাজীপুরের চার উপজেলা ছুঁয়েছে বেলাই বিল। সপরিবারে ঘুরে এসে লিখেছেন মনিরুল ইসলাম
বেলাই বিলে যাওয়ার অনেক পথ আছে, কিন্তু আমার পছন্দ গাজীপুরের কালীগঞ্জ হয়ে যাওয়া। যাত্রাটি শুরু হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীর শান্ত বুক থেকে। দুপুরের খাবার নিয়েই আমরা কালীগঞ্জ গুদারা ঘাট থেকে নৌকায় উঠলাম। বেলাই বিলে যে লঞ্চের মতো নৌকাগুলো চলে, আমাদের নৌকাটি সেরকম নয়। মাঝারি আকারের, ওপরে শামিয়ানা টানানো, যাতে রোদ না লাগে।
একপর্যায়ে নৌকাটি যখন সর্পিল এক খালের ভেতর সেঁধিয়ে গেল, তখন থেকেই শুরু হয় এক মায়াবী জগৎ। শীতের দিনে এ খালের পানি হয়তো একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে, কিন্তু বর্ষায় তা কানায় কানায় পূর্ণ। খালের দুপাড়ে করচ, হিজল, সুউচ্চ রেইনট্রি আর ঘন বাঁশঝাড়ের এমন নিবিড় জটলা যে, সারাক্ষণ এক মায়াবী ছায়াশীতল পরিবেশ চারপাশকে আগলে রাখে। কোনো কোনো জায়গায় গাছপালা মাথার ওপর চাঁদোয়া তৈরি করেছে, দুপুরেও সেখানে এক ধরনের রহস্যময় অন্ধকার নেমে এসেছে। শান্ত জলের ওপর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ও পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এ খালের বুক চিরে কয়েকটা সাধারণ সেতু আর পুরনো রেল সেতুর তলা দিয়ে নৌকা এগিয়ে চলে।
হুট করেই যেন সবুজের মায়া কাটিয়ে নৌকাটি গিয়ে আছড়ে পড়ে দিগন্তবিস্তৃত বেলাই বিলের সুবিশাল জলরাশিতে। শাপলা ফুলের সমারোহ, দেশি মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার আর চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য— যেদিক থেকেই তাকানো যাক না কেন, এ বিলের গুরুত্ব আর মহিমার শেষ নেই। স্থানীয় মানুষজন আর ঘাটের মাঝিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, এ বিলের বুকটা প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। গাজীপুর সদর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ আর শ্রীপুর— এ চার জনপদ ছুঁয়েছে বিলটি।
মাঝখান দিয়ে সর্পিল গতিতে বয়ে গেছে দুটি বড় খাল। এগুলো আবার নানারকম শাখা-প্রশাখার জাল বুনে শেষমেশ গিয়ে মিলেছে তুরাগ, চিলাই আর বালু নদের সঙ্গে।
সুনীল জলরাশির কেটে ছুটে চলেছে নৌকা। বিলের মাঝে একটা দ্বীপের মতো পেয়ে থামলাম। গাছের ছায়ায় নৌকার ইঞ্জিন থামিয়ে বিলের দিকে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। গাছের ডালে রঙিন মাছরাঙা ধৈর্য নিয়ে বসে আছে মাছ শিকারের আশায়। নৌকার পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে চলে একটি সাপ। এদিকটায় কেবল শন শন বাতাসের শব্দ। বিলের মাঝে নৌকায় বসে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। নৌকায় বসে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম।
আবার চলতে শুরু করল নৌকা। কিছুদূর যেতে পৌঁছে গেলাম খাতিয়া, গাজীপুরের আরেক ভাইরাল প্লেস। এখানে বিলে পানি ছুঁয়ে দুদিক দিয়ে পাকা রাস্তা এসে ব্রিজের সঙ্গে মিশেছে। জায়গাটা অদ্ভুত রকমের সুন্দর। এখনই এত মানুষ, বিকালে তো আরও ঢল নামে। খাতিয়া ব্রিজ পেরিয়ে রওনা দিলাম বাজারের দিকে।
এবার আমাদের গন্তব্য পুবাইল বাজার। নদীর পাশে ‘ভাওয়াল পরগনা’ (শ্মশানঘাট বা শ্মশানবাড়ি)। চাইলে নদীর পাশেই এ শ্মশানবাড়িটি দেখে আসতে পারেন। পথে এক লোককে মাছ ধরতে দেখে নৌকা থামিয়ে বিলের তাজা মাছ কিনলাম। পুবাইল বাজার গিয়ে নেমে পড়লাম। বাজারে মিষ্টি ও দই খেয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে এলাম ঢাকায়।
কীভাবে যাবেন
গুলিস্তান থেকে বাসে গাজীপুর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকশা বা টেম্পোতে কানাইয়া বাজার। ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকে। দরদাম করে উঠে পড়ুন।








