চুলে চমক লুকে বদল

মডেল: আনসা তাসফিহা সুহি; সাজ: শামীম; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
কাট নয়, শুধু স্টাইলিংয়েই প্রতিদিনের চেনা চুল ও লুক হয়ে ওঠে নতুন। চুলের স্টাইলিং নিয়ে লিখেছেন ভাবনা রহমান
চুলে স্টাইল করতে হলে পার্লারে যেতে হবে কিংবা সবসময় কাঁচির নিচে বসতে হবে এমন নয়। একই চুলকে একটু অন্যভাবে বাঁধা, সামান্য টুইস্ট, একটি ক্লিপ, রিবন কিংবা স্কার্ফের ছেঁায়াতেই বদলে যেতে পারে চেনা লুক। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের সাজে হেয়ারস্টাইল এখন আর নিছক চুল সাজানোর বিষয় নয়, বরং পোশাকের মতোই এটি হয়ে উঠেছে নিজেকে প্রকাশের একটি অংশ। ইউনিভার্সিটির ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্যাফে কিংবা পার্টি— আয়োজন বদলালে বদলে যেতে পারে চুলের স্টাইলও।
নতুন কাট নয়, নতুন স্টাইলিং
চুলে পরিবর্তন মানেই নতুন কাট নয়। বরং নিজের চুলের দৈর্ঘ্য ও স্বাভাবিক টেক্সচার ঠিক রেখেই স্টাইলিংয়ে আনা যায় নতুনত্ব। আজ হাফ-আপ, কাল বাবল পনিটেইল, পরদিন মেসি বান— একই চুলেই তৈরি হতে পারে একাধিক লুক। বর্তমানে এ প্রবণতা কিশোরী ও তরুণীদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ প্রতিদিন পার্লারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, নেই বড় কোনো পরিবর্তনের ঝুঁকিও। শুধু আয়নার সামনে কয়েক মিনিট সময় আর কিছুটা কল্পনাশক্তিই যথেষ্ট।
নিজের চুলের দৈর্ঘ্য ও স্বাভাবিক টেক্সচার ঠিক রেখেই স্টাইলিংয়ে আনা যায় নতুনত্ব। আজ হাফ-আপ, কাল বাবল পনিটেইল, পরদিন মেসি বান। একই চুলেই তৈরি হতে পারে একাধিক লুক
হাফ-আপ, হাফ-ডাউন
পুরো চুল খোলা নয়, আবার পুরোপুরি বাঁধাও নয়— এ মাঝামাঝি স্টাইলটিই হাফ-আপ, হাফ-ডাউন। মাথার ওপরের বা সামনের অংশের চুল তুলে পেছনে ক্লিপ, রাবার, বো কিংবা রিবন দিয়ে আটকে দেওয়া যায়। বাকি চুল থাকবে খোলা। কিশোরীদের জন্য রঙিন ক্লিপ, বো কিংবা স্ক্রাঞ্চি ব্যবহার করলে লুকে আসবে মিষ্টি ও প্রাণবন্ত ভাব। তরুণীরা চাইলে মিনিমাল ক্লিপ বা সাদামাটা রাবার দিয়ে রাখতে পারেন একটু পরিণত ও পরিপাটি আবহ। সোজা চুলে যেমন সুন্দর, তেমনি হালকা ওয়েভি চুলেও বেশ মানিয়ে যায় এই স্টাইল।
বাবল হেয়ারস্টাইলে নজর
সাধারণ পনিটেইলকে এক নিমেষে অন্যরকম করে তুলতে পারে বাবল হেয়ারস্টাইল। প্রথমে পনিটেইল করে নিন। এরপর কিছুটা দূরত্ব রেখে পরপর কয়েকটি রাবার লাগিয়ে প্রতিটি অংশ সামান্য ফাঁপিয়ে দিন। তৈরি হবে ছোট ছোট বাবল। চাইলে বেণিতেও একই কৌশল ব্যবহার করা যায়। কিশোরীদের জন্য রঙিন রাবার হতে পারে মজার সংযোজন। আর একটু সিম্পল ও স্মার্ট লুক চাইলে কালো, বাদামি কিংবা চুলের কাছাকাছি রঙের রাবার বেছে নিন। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, স্টাইলটি দেখতে বেশ জটিল মনে হলেও এতে সাজতে খুব বেশি সময় লাগে না।
মেসি বানে ঠিকঠাক
সবসময় নিখুঁত করে চুল বাঁধার দরকার নেই। বরং সামান্য এলোমেলোভাবও হতে পারে স্টাইলের অংশ। চুল পেছনে নিয়ে আলগাভাবে পেঁচিয়ে ক্লিপ বা রাবার দিয়ে আটকে তৈরি করা যায় মেসি বান। সামনের দুপাশে কয়েক গোছা চুল ইচ্ছে করে ছেড়ে দিলে মুখের চারপাশ কোমল দেখাবে। ক্যাজুয়াল পোশাকের সঙ্গে এটি যেমন মানানসই, তেমনি ফিউশন পোশাকেও তৈরি করতে পারে অনায়াস, আধুনিক লুক। তবে এলোমেলো মানেই অগোছালো নয়। মেসি বানেও একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকা চাই।
চুলে জড়ানো স্কার্ফ
স্কার্ফের ব্যবহার শুধু গলা কিংবা ব্যাগেই সীমাবদ্ধ নেই। এবার এটি হতে পারে চুলেরও আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ। পনিটেইলের গোড়ায় ছোট স্কার্ফ বেঁধে দেওয়া সম্ভব, লম্বা স্কার্ফ বেণির সঙ্গে জড়িয়ে নেওয়া যায়। আবার চাইলে মাথায় হেডব্যান্ডের মতোও ব্যবহার করতে পারেন। একরঙা পোশাকের সঙ্গে প্রিন্টেড স্কার্ফ এনে দিতে পারে সুন্দর কনট্রাস্ট। আর পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে পুরো সাজেই ফুটে উঠবে ভিন্নমাত্রা।
মুখঘেঁষা চুলে কোমল লুক
পনিটেইল, লো বান কিংবা মেসি বান— যে স্টাইলই হোক, সামনের দুপাশে কয়েক গোছা চুল আলগা করে ছেড়ে দেওয়া যায়। এই ফেস-ফ্রেমিং চুলে মুখের চারপাশ কোমল দেখায় এবং সাজে আনে স্নিগ্ধতা। বিশেষ করে তরুণীদের ক্যাজুয়াল লুকে এটি বেশ ভালো লাগে। খুব টানটান করে বাঁধা চুলের বদলে সামান্য আলগা স্টাইল পুরো চেহারাকেই নান্দনিক করে তোলে। তবে চুলের গোছা যেন অতিরিক্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
বিনুনিতে নতুনত্ব
ছোটবেলার পরিচিত বেণিই ফিরেছে নতুন রূপে। এবার বেণি হতে পারে একটু ঢিলেঢালা, হতে পারে সাইডে, আবার রিবন কিংবা স্কার্ফ জড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে এর সঙ্গে। চাইলে বেণির কিছু অংশ আলতো করে ফাঁপিয়ে নিয়ে তৈরি করা যায় ভিন্ন আবহ। ক্যাজুয়াল পোশাকে সাধারণ বেণি যেমন মিষ্টি ও তারুণ্যময়, তেমনি ফিউশন বা শাড়ির সঙ্গে সাইড ব্রেইড কিংবা একটু সাজানো বিনুনি এনে দিতে পারে আধুনিকতা।
কোথায় কেমন স্টাইল
ক্লাস টাইমের জন্য লো পনিটেইল, দুই বেণি, হাফ-আপ কিংবা সাধারণ ক্লিপে বাঁধা চুল হতে পারে স্বচ্ছন্দ পছন্দ। এগুলো যেমন সহজে তৈরি করা যায়, তেমনি সারা দিন সামলানোও সম্ভব। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা ক্যাফেতে যাওয়ার সময় একটু মজার ও স্টাইলিশ লুকের জন্য বেছে নিতে পারেন মেসি বান, বাবল পনিটেইল কিংবা স্কার্ফে বাঁধা পনিটেইল। সঙ্গে রঙিন রিবন বা স্ক্রাঞ্চি যোগ করলে সাজে আসবে বাড়তি চমক। পার্টিতে যেতে চাইলে হালকা ওয়েভি চুল, সাজানো লো বান, হাফ-আপ কিংবা অ্যাকসেসরিজসহ ব্রেইড মানিয়ে যাবে। তবে পোশাক যদি বেশ জমকালো হয়, চুলের স্টাইল খুব বেশি জটিল না রাখাই ভালো। আর শাড়ি বা ফিউশন পোশাকের সঙ্গে লো বান, সাইড ব্রেইড, হাফ-আপ কিংবা সুন্দর হেয়ারপিন বেছে নিতে পারেন। সব ক্ষেত্রেই পোশাকের ধরন ও পুরো সাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চুলের স্টাইল রাখুন পরিপাটি ও স্বাভাবিক।
চুলের ধরন বুঝে স্টাইল
একই হেয়ারস্টাইল সোজা, ওয়েভি ও কেঁাকড়া চুলে একরকম দেখাবে না। তাই চুলের স্বাভাবিক টেক্সচারকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সেটিকেই কাজে লাগানো ভালো। সোজা চুলে মসৃণ লো পনিটেইল, হাফ-আপ কিংবা বাবল স্টাইল বেশ সুন্দর ফুটে ওঠে। ওয়েভি চুলে স্বাভাবিক ঢেউটুকু রেখে মেসি বান, হাফ-আপ কিংবা আলগা পনিটেইল করা যায়। অতিরিক্ত স্ট্রেইট করার প্রয়োজন নেই। আর কেঁাকড়া চুলে কার্ল লুকিয়ে ফেলার বদলে সেটিকেই স্টাইলের অংশ বানান। হাফ-আপ, লো পনিটেইল কিংবা আলগা বান— সব ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক কার্লকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
পোশাকের রঙ ও ধরন মাথায় রেখে অ্যাকসেসরিজ বেছে নিলে সাজে আসে আরও পরিপাটি ভাব। তবে চুলের স্টাইল যদি নজরকাড়া হয়, অ্যাকসেসরিজ রাখুন সিম্পল
অনুষঙ্গে বাড়তি চমক
হেয়ারস্টাইল বদলানোর পাশাপাশি চুলের অনুষঙ্গেও আনা যায় বৈচিত্র্য। হাফ-আপে সুন্দর ক্লিপ, বেণিতে রিবন, পনিটেইলে স্ক্রাঞ্চি, বানে হেয়ারপিন কিংবা খোলা চুলে হেডব্যান্ড— ছোট্ট একটি অনুষঙ্গই বদলে দিতে পারে পুরো লুক। পোশাকের রঙ ও ধরন মাথায় রেখে অ্যাকসেসরিজ বেছে নিলে সাজে আসে আরও পরিপাটি ভাব। তবে চুলের স্টাইল যদি নজরকাড়া হয়, অ্যাকসেসরিজ রাখুন সিম্পল। আবার সাধারণ হেয়ারস্টাইলে একটু আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ যোগ করা যেতে পারে।
পার্লারে নয়, নিজের হাতেই
হেয়ারস্টাইল মানেই পার্লারে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা নয়। কয়েক মিনিটেই তৈরি করা সম্ভব— এমন কিছু স্টাইল নিজেই আয়ত্ত করে নিতে পারেন। চুল পেছনে নিয়ে আলগা করে পেঁচিয়ে ক্লিপ বা রাবার দিয়ে আটকে দিন। সামনের দুপাশে কয়েক গোছা চুল ছেড়ে দিলেই তৈরি হয়ে যাবে মেসি বান। পনিটেইল করে কিছুটা পরপর রাবার আটকে নিয়ে, প্রতিটি অংশ আলতো করে ফাঁপিয়ে দিলেই তৈরি বাবল। সাধারণ বেণির সঙ্গে সরু রিবন জড়িয়ে নিলে সাদামাটা পোশাকেও আসবে নতুনত্ব। আর মাথার ওপরের অংশটুকু তুলে একটি সুন্দর ক্লিপ দিয়ে আটকে দিলেই কয়েক মিনিটে তৈরি হবে হাফ-আপ।
স্টাইলিং হবে, চুলের ক্ষতি নয়
সাজতে গিয়ে চুলের যত্ন ভুলে গেলে চলবে না। রূপবিশেষজ্ঞ শোভন সাহা বললেন, প্রতিদিন খুব শক্ত করে পনিটেইল বা বেণি বাঁধা এড়িয়ে চলুন। ভেজা চুলে টান দিয়ে আঁচড়ানো কিংবা শক্ত করে বাঁধাও ঠিক নয়। হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার বা কার্লিং আয়রনের অতিরিক্ত ব্যবহার চুল শুষ্ক ও ভঙ্গুর করে দিতে পারে। তাই হিট স্টাইলিং যতটা সম্ভব সীমিত রাখুন। অতিরিক্ত হেয়ার স্প্রে বা স্টাইলিং প্রোডাক্ট প্রয়োজনের বেশি ব্যবহার না করাই ভালো। দিন শেষে চুল খুলে আলতো করে আঁচড়ে নেওয়া এবং নিয়মিত মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা দরকার। কারণ চুল সাজানোর পাশাপাশি সুস্থ রাখাটাও সমান জরুরি। চুলের সৌন্দর্য শুধু তার দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব কিংবা কাটে নয়; কীভাবে তাকে সাজানো হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই চুলকে প্রতিদিন একইভাবে না রেখে একটু ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল করুন। কখনো বাবল, কখনো হাফ-আপ, কখনো রিবন, কখনো স্কার্ফ, আবার কোনো দিন একেবারে সহজ মেসি বান— চেনা চুলেই তৈরি হোক প্রতিদিনের নতুন লুক।






