জীবনযাপন
বইয়ের কাছে ফিরতে চাইলে

মডেল: সামিয়া নওশাবা ত্রয়ী । ছবি: মোজাফ্ফর হোসেন
টিফিনের ফাঁকে, ছুটির দিনে কিংবা পড়ার টেবিলের আড়ালে গল্পের বই পড়ার সেই দিনগুলো কারও কারও কাছে শুধুই স্মৃতি। হারিয়ে যাওয়া সেই অভ্যাস ফিরে পাওয়ার উপায় জানাচ্ছেন স্বর্ণা রায়
স্কুলের ব্যাগে বইয়ের নিচে লুকিয়ে রাখা গল্পের বইটির কথা মনে আছে? ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন আর বেঞ্চের নিচে খোলা ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা কোনো রোমাঞ্চ উপন্যাসে চোখ আটকে আছে। টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই বন্ধুদের সঙ্গে গল্প নয়, বরং কে আগে বইটা শেষ করবে— সেই প্রতিযোগিতা। বাড়ি ফেরার পরও অনেক সময় সুযোগ পেলেই ‘আউটবুকে’ ডুব দেওয়ার সেই দৃশ্যগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বইয়ের জায়গা নিয়েছে মোবাইলের পর্দা, কয়েক মিনিটের অবসরে গল্পের বদলে স্ক্রলিং আর রাতজাগার সঙ্গী হয় একের পর এক ছোট ভিডিও ক্লিপ। অথচ কোনো এক বিকালে পুরনো বইয়ের আলমারি খুললে এখনো বুকের ভেতর কেমন একটা টান লাগে! সেই অভ্যাসকে জাগিয়ে তুলতে দরকার শুধু অল্প সময় আর নিজের জন্য রাখা একটুখানি নির্জনতা।
ফিরতে পারি, কিন্তু কেন ফিরব: বই শুধু তথ্য দেয় না, আমাদের ভেতরের পৃথিবীটাকেও বড় করে তোলে। একটি গল্প পড়তে গিয়ে আমরা এমন একজন মানুষের জীবনে ঢুকে পড়ি, যার জীবন আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তার আনন্দ, ভয়, ভুল, ভালোবাসা কিংবা হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনকেও নতুন চোখে দেখতে শিখি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘মনের বন্ধু’র সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর নুসরাত জাহান খায়রুননেসার মতে, ছোটবেলায় বই পড়ার সময় শিশু শুধু লেখা পড়ে না; গল্পের ছবি, চরিত্র ও ঘটনাগুলো নিজের মতো কল্পনা করে। এর মধ্য দিয়ে তার কল্পনাশক্তি তৈরি হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বই মানুষের চিন্তা, আত্মোপলব্ধি এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে দেখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। একটি ভালো চরিত্র কখনো কখনো অদৃশ্য বন্ধুর মতো পাশে থাকে। তার কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের ভাবায়, কোনো ভুল নিজের ভুলের কথা মনে করিয়ে দেয়, আবার কোনো সংকট সামলানোর ধরন হয়তো জীবনের কঠিন সময়ে নতুন সাহস দেয়।
নতুন বইয়ের গন্ধ, পুরনো পাতার হলদেটে রঙ, আগের পাঠকের পেনসিলের দাগ, ভাঁজ করা পাতা— সবকিছু মিলিয়ে বই হয়ে ওঠে স্মৃতির বাক্স
বইয়ের ঘ্রাণে বুঁদ: ই-বুকের যুগে বই পড়া সহজ হয়েছে, কিন্তু কাগজের বইয়ের আলাদা একটা মায়া আছে। নতুন বইয়ের গন্ধ, পুরনো পাতার হলদেটে রঙ, কোনো এক আগের পাঠকের পেনসিলের দাগ, ভাঁজ করা পাতা— সবকিছু মিলিয়ে বই হয়ে ওঠে স্মৃতির বাক্স। তাই বহুদিন পর পাঠাভ্যাসে ফিরতে চাইলে প্রথমেই নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বই হাতে নেওয়ার দরকার নেই। বরং ছোটবেলায় যে বই ভালো লেগেছিল, সেটি আবার খুলে বসতে পারেন। হয়তো দেখবেন, গল্পটি আগের মতো নেই; আপনিই বদলে গেছেন! যে চরিত্রকে একসময় নায়ক মনে হয়েছিল, এখন তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন জাগছে। যে গল্প একসময় শুধু রোমাঞ্চ দিয়েছিল, এবার সেখানে খুঁজে পাচ্ছেন জীবনের অন্য কোনো অর্থ।
দশ মিনিটের চুক্তি: বই পড়ার অভ্যাস ফেরাতে এক ঘণ্টা সময় বের করার দরকার নেই। প্রতিদিন নিজের সঙ্গে মাত্র ১০ মিনিটের একটি চুক্তি করুন। ঘুমানোর আগে, সকালের চায়ের সঙ্গে কিংবা দুপুরের বিরতিতে যে সময়টুকু আপনার জন্য সহজ। প্রথম দিন পাঁচ-ছয় পৃষ্ঠা পড়লেও সমস্যা নেই। লক্ষ্য হোক বই শেষ করা নয়, বরং বইয়ের সঙ্গে আবার সম্পর্ক গড়ে তোলা। কয়েক দিন পর দেখবেন, দশ মিনিট কখন যে বিশ মিনিট হয়ে গেছে, টেরই পাননি!
বাছাইয়ে খেয়াল: অনেকেই বই পড়ার অভ্যাস শুরু করতে গিয়ে এমন বই হাতে নেন, যেটি পড়া উচিত বলে মনে করেন। তারপর কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অথচ বই পড়া কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়। তাই শুরুতে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিন। গা ছমছমে কিছু ভালো লাগলে রহস্য, ঘোরাঘুরি ভালো লাগলে ভ্রমণকাহিনি, ভালোবাসার গল্পে মন বসলে প্রেমের উপন্যাস, আবার কবিতা ভালো লাগলে কাব্যই পড়ুন। একবার পড়ার আনন্দ ফিরে এলে কঠিন বা মননশীল বইয়ের কাছেও পৌঁছানো সহজ হবে।
মোবাইল একটু দূরে: একটি বইয়ের সঙ্গে বসে বারবার ফোনের নোটিফিকেশন দেখলে মুদ্রিত হরফের জগতে ঢোকা কঠিন। তাই পড়ার সময় ফোনটি সাইলেন্ট করে দূরে রাখতে পারেন। সম্ভব হলে বিছানা বা কাজের টেবিলের পাশে ফোনের বদলে বই রাখুন।
দিনের ফাঁকে: বই পড়ার জন্য সবসময় নিরিবিলি সন্ধ্যা বা ছুটির দিন পাওয়া যাবে না। যানজটে বসে থাকা, ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা, অফিসের লাঞ্চ ব্রেক কিংবা ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট— এই ছোট ছোট ক্ষণই হয়ে উঠতে পারে বইয়ের সময়। ব্যাগে সবসময় একটি পাতলা বই রাখতে পারেন। অপেক্ষার প্রহরগুলোতে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে নিতে সুবিধা হবে।
নিজের কাছে ফেরা: বই পড়ার অন্যতম সুন্দর দিক হলো, এটি আমাদের কিছু সময়ের জন্য নিজের ভেতরের শব্দগুলো শুনতে দেয়। সারা দিনের কাজ, ফোন, মেসেজ, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, দায়িত্ব— সবকিছুর বাইরে বইয়ের কয়েকটি পাতা যেন একটি ছোট দরজা খুলে দেয়। সেখানে কিছুক্ষণ শুধু আপনি আর আপনার ভাবনা। হয়তো কোনো গল্প পড়তে পড়তে পুরনো কোনো বিকাল মনে পড়ে যাবে। কোনো কবিতার লাইন হঠাৎ মনে করিয়ে দেবে বহুদিন দেখা হয়নি এমন কাউকে। কোনো উপন্যাসের চরিত্রের একাকিত্ব নিজের অজান্তেই ছুঁয়ে যাবে। আবার কোনো হাসির গল্প হয়তো ব্যস্ত দিনের শেষে আপনাকে একা একাই হাসিয়ে দেবে।







