নবজাতকের মুখে গোঁফ থাকার ভাইরাল ভিডিওটি কি আসল

ছবি: আগামীর সময়
ঘন কালো গোঁফসহ একটি নবজাতক শিশুর ভিডিও বাংলাসহ একাধিক ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটি নিয়ে নানা মন্তব্য ও প্রশ্ন উঠেছে যে, কোনো শিশু আসলেই এমন চেহারা নিয়ে জন্ম নিতে পারে কি না। এই অস্বাভাবিক দৃশ্যটি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া ও কৌতুকের জন্ম দিয়েছে, যারা শিশুটির চেহারায় মুগ্ধ হয়েছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে শিশুটি প্রাপ্তবয়স্কদের মতো স্টাইলে জন্মেছে। কিছু ব্যবহারকারী পরিস্থিতিটিকে হালকাভাবে নিলেও, অন্যরা এই চুলের উপস্থিতির কারণ নিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। ভিডিওটি অনলাইনে লাখ লাখ ভিউ কুড়িয়েছে। অনেকে এই অদ্ভুত ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করেছেন যে ইকুয়েডরে এক মা এমন একটি সন্তান প্রসব করেছেন যার মুখে গোঁফ রয়েছে।
তবে ফ্যাক্ট-চেক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত দাবিটি মিথ্যা এবং ভিডিওটি ডিজিটালি সম্পাদনা করা।
কী ভিডিও ছড়াচ্ছে?
এর মধ্যে এক্সে ‘@MarioNawfal’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়— ‘একটি নবজাতক শিশু একদম 'পূর্ণ গোঁফ' নিয়ে পৃথিবীতে আসার কারণে তুমুল ভাইরাল হয়েছে! ভাই যেন কিন্ডারগার্টেন পার না করেই সোজা তার 'মিডলাইফ ক্রাইসিস'এ চলে গেছে।’
ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটি তখনও প্রসব কক্ষে একটি সাদা তোয়ালে জড়ানো অবস্থায় আছে, শিশুটির শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক দেখায় এবং তার চোখ খোলা এবং উপরের ঠোঁটের উপরে গোঁফের মতো কালো চুল রয়েছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেখেছেন, ১১ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়েছে এবং সাড়ে ৪ হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে ভিডিওটি ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, গোঁফটি শিশুর মুখের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সাথে সঠিকভাবে সামঞ্জস্য রাখছে না। শিশুটি যখনই মুখ বাঁকাচ্ছে বা চোখ পিটপিট করছে, গোঁফের প্রান্তগুলো কিছুটা কেঁপে উঠছে। এছাড়া চুলের ওপর আলোর প্রতিফলনও স্বাভাবিক নয়, যা শিশুর ত্বকে পড়া আসল আলোর সাথে মিলছে না এবং এমনকি একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে তা অদৃশ্যও হয়ে যায়। যা শিশুটির মুখে কালো চুল যোগ করার জন্য ভিডিওটি ডিজিটালভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
এছাড়াও শিশুটির পরিচয়, জন্মস্থান, বা যে হাসপাতালে ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সে সম্পর্কেও কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য নেই। এই বিবরণগুলোর অনুপস্থিতি পোস্টগুলোতে উপস্থাপিত গল্পটি যাচাই করা কঠিন করে তোলে।
যাচাইয়ে যা মিলছে
এআই শনাক্তকরণ টুলে ভিডিওটি পরীক্ষা করা হলে প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং তারও বেশি ডিজিটালি পরিবর্তনের প্রমাণ মেলে। অধিকতর যাচেইয়ে ডিপফেইক শনাক্তকরণ ভিডিও টুলসে স্প্যানিশ ক্যাপশনযুক্ত ("যখন সে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে জন্ম নেয়...") ২১৩ ফ্রেম এবং প্রতি সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেম গতির স্কিমা ২.০ (Schema 2.0) ফরম্যাটের ssstwitter.com_1792933802527.mp4 নামের এই ভিডিওটি বিশ্লেষণ করার পর এআই শনাক্তকরণ টুলের ফলাফলে এর জালিয়াতির সম্ভাবনা বা সামগ্রিক ভুয়া হওয়ার মাত্রা শতভাগ (১০০%)—যা নির্ধারিত রেফারেন্স ৪৫ শতাংশের অনেক ওপরে—বলে চিহ্নিত হয়েছে। রান লগের তথ্য অনুযায়ী, EfficientNet, EfficientNet_FaceSwap এবং Effort মডিউলের মাধ্যমে ভিডিওটির ০:০০ থেকে ০:০২ সেকেন্ড সময়সীমার মধ্যে এই ডিপফেক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়।
রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে ভারতের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, ব্রাজিলের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘Boatos.org’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক ‘আলবাবা’ (Al Bawaba)-র বিশেষ অনলাইন সংবাদ বিভাগও এটিকে সত্য নয় বলে প্রমাণ পায়। এছাড়া ইকুয়েডরের কোনো মূলধারার বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাটিকে সত্য বলে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাকিল আহম্মদকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নবজাতকের গোঁফযুক্ত ছবিটি দেখানো হলে তিনি জানান, ছবিটি ভুয়া। নবজাতকের মুখে এ ধরনের সুস্পষ্ট ও গোঁফের মতো ঘন লোম সাধারণত দেখা যায় না। তবে নবজাতকের শরীরে ল্যানুগো (Lanugo) নামে একধরনের সূক্ষ্ম ও নরম লোম থাকতে পারে। মায়ের গর্ভে থাকাকালে এই লোম তৈরি হয় এবং ভ্রূণের ত্বক সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। সাধারণত শিশুর কাঁধ, পিঠ কিংবা কপালে এ ধরনের লোম দেখা যেতে পারে। কখনো কখনো ঠোঁটের ওপরেও সূক্ষ্ম লোম থাকতে পারে, তবে তা সাধারণত খুব পাতলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির মতো স্পষ্ট ও সুগঠিত গোঁফ নবজাতকের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নয়।
বুম বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকার ও এআই রিসার্চার তাওসিফ আকবর বলেন, ‘বর্তমান ডিজিটাল যুগে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অস্বাভাবিক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কনটেন্ট দেখে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস করা বা যাচাই ছাড়াই শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।’
নবজাতকের গোঁফযুক্ত এই ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও গুগলে সার্চ করে দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠিত কোনো সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে কি না। পাশাপাশি, নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিয়মিত এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ভিডিও দেখতে থাকলে একপর্যায়ে এসব কনটেন্টের সত্যতা যাচাই করার প্রবণতা কমে যেতে পারে। ফলে বাস্তব ও কৃত্রিম কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের ভিডিওর অবাধ প্রচার মানুষের চিন্তাভাবনা, উপলব্ধি ও তথ্য গ্রহণের প্রবণতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।’
অতএব, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ঘন কালো গোঁফসহ নবজাতক শিশুর ভিডিওটি ভুয়া। ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পাদিত এই ভিডিওটিকে সত্য দাবি করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।






