হাঙ্গেরির ‘উন্নয়নে’ বাংলাদেশের ছাপ

হাঙ্গেরির জালায়েগারজেগ এর গোলচত্বরটি একটি নতুন রেললাইনকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হলেও সেই রেললাইনটি এখনও তৈরি করা হয়নি। ছবি: সংগৃহীত
রাস্তার পাশে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা, পশ্চিম হাঙ্গেরির জালায়েগারজেগ শহরের এই গোলচত্বর তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের টাকা অনুদান দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
পরিকল্পনা ছিল দারুণ; এখানে হবে একটি নতুন রেললাইন আর বিশাল কনটেইনার টার্মিনাল। সমুদ্রসীমা নেই এমন দেশগুলোর জন্য এ পথে সহজেই মালপত্র আনা-নেওয়া করা যাবে। চেক প্রজাতন্ত্র, পোল্যান্ড বা স্লোভাকিয়ার পণ্য আর রাজধানী বুদাপেস্ট হয়ে ঘুরপথে আসবে না, সরাসরি এ পথে দ্রুত পৌঁছে যাবে।
কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল লঙ্কাকাণ্ড; গোলচত্বর বানানো শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে, অথচ সেখানে কোনো রেললাইনের চিহ্নও নেই। জনমানবহীন ফসলি মাঠের মাঝে অলস পড়ে আছে কোটি টাকার গোলচত্বর। সরকার কবে রেললাইন বানাবে, সেই আশায় প্রহর গুনছে একলা দাঁড়িয়ে থাকা মোড়টি।
বাংলাদেশের খাল, বিল, মাঠেও চোখে পড়ে এমন অসংখ্য ‘উন্নয়ন’স্থাপনা। কোথাও দেখা যায়, খালের ওপর হয়েছে সেতু, কিন্তু সড়ক নেই। আবার কোথাও দেখা যায়, সেতু দাঁড়িয়ে আছে বিলের মাঝে। সড়ক-সেতু থাকার পরও করা যায় না ব্যবহার চোখে পড়ে এমন দৃশ্যও।
এটাই হাঙ্গেরির বর্তমান শাসন ব্যবস্থার নমুনা বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের বিরোধীদের অভিযোগ।
তাদের দাবি, ওরবান মুখে সারাক্ষণ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে গালমন্দ করেন। এ জোটকে অভিহিত করেন দুর্নীতিবাজ ও পতনশীল শক্তি, কিন্তু আবার সেই ইইউর কাছ থেকেই দু’হাত ভরে টাকা নিতে পিছপা হন না তিনি।
মূলত ইইউ তাদের জোটের গরিব দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য এই তহবিল দেয়, কিন্তু হাঙ্গেরিতে টাকাগুলো দিয়ে এমন সব অকেজো প্রজেক্ট বানানো হয়েছে যেগুলোকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘সাদা হাতি’। অর্থাৎ, নির্মাণ করতেও অনেক খরচ, আবার রক্ষণাবেক্ষণেও লাগছে বিপুল অরর্থ। কিন্তু, মিলছে না কোনো ফল।
বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান অরবানের ভাষ্য, গত দশকে ইইউর টাকা পকেটে ভরার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ওরবান ছিলেন ওস্তাদ। এটা ছিল তার একটা বড় কৌশল।
দুর্নীতি নেই এমন দেশের সূচকে বর্তমানে হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে।
জালায়েগারজেগের এই গোলচত্বর নিয়ে প্রথম খবর প্রকাশ করে হাঙ্গেরির একটি সংবাদমাধ্যম।
শহরের মেয়র জোল্টান বালাইজ জানিয়েছেন, ২০২১ সালে ধুমধাম করে স্থাপন করা হয় রেল টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর। দুই বছরের মধ্যে ইইউর টাকায় লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য গোলচত্বরটি বানিয়ে ফেলে নগর কর্তৃপক্ষ, কিন্তু রেললাইনের কাজ এখনো আটকে আছে টেন্ডার বা নিলাম পর্যায়েই। ধারণা করা হচ্ছে, কাজ শুরু হলেও ২০২৯ সালের আগে সেখানে চলবে না ট্রেন।
হাঙ্গেরিতে এমন আজব প্রকল্পের অভাব নেই। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড প্রেসম্যান একবার হাঙ্গেরির একটি ‘ফরেস্ট ওয়াকওয়ে’ বা বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার রাস্তার ছবি শেয়ার করেছিলেন। দেখা গেল, আকাশছোঁয়া সেই হাঁটার রাস্তা আছে ঠিকই, কিন্তু আশেপাশে কোনো গাছ বা বন নেই।
আবার পর্যটকদের জন্য তৈরি এক ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের উচ্চতা পাওয়া গেল মাত্র এক মিটারের মতো।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে চিন্তা না করে হাঙ্গেরি সরকার এসব উদ্ভট প্রকল্প নিয়ে মেতে আছে। বর্তমানে নানা অনিয়মের কারণে ইইউ হাঙ্গেরির জন্য বরাদ্দ ১৮ বিলিয়ন ইউরো আটকে দিয়েছে বলে বিরোধীদের দাবি।
আজ রবিবারের নির্বাচনে এই তহবিল বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির। বিরোধী দলগুলো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তারা ক্ষমতায় এলে ইইউর সঙ্গে ঝামেলা মিটিয়ে ছাড় করাবে আটকে থাকা টাকা। দুর্নীতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তারা।
এরই মধ্যে নতুন কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে জালায়েগারজেগের মেয়রের আরেক পরিকল্পনা।
সরকার যদি রেললাইনটি শেষ করে, তবে রেলের মালপত্র সামলাতে সেখানে আরও একটি গোলচত্বর বানাবেন তারা। আর সেটির জন্য ইইউর কাছে চাওয়া হবে আরও প্রায় ৩৫ কোটি টাকা- ঘোষণা মেয়রের।
সূত্র: সিএনএন

