কান উৎসবের ধ্রুপদি বিভাগে দক্ষিণ ভারতীয় ছবি

‘আম্মা আরিয়ান’-এর দৃশ্য ও কান উৎসবের লোগোর কোলাজ
ভারতের মালয়ালম ভাষায় নির্মিত ‘আম্মা আরিয়ান’ (রিপোর্ট টু মাদার) মুক্তির ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবের ধ্রুপদি বিভাগে। এজন্য ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবিটির প্রিন্ট পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। কান ক্ল্যাসিকস বিভাগে এর প্রদর্শনীতে অংশ নেবেন প্রধান অভিনেতা জয় ম্যাথিউ, চিত্রগ্রাহক বেনু, চিত্র সম্পাদক বিনা পাল এবং ভারতের ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওডেসা কালেক্টিভের সহযোগিতায় ‘আম্মা আরিয়ান’ পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন করেছে ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। এনএফডিসি’তে (ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া) সংরক্ষিত আছে ছবিটির দুটি ৩৫ মিলিমিটার রিলিজ প্রিন্ট। এরমধ্যে একটি প্রিন্টকে ইতালির লিমাজিন রিত্রোভাতা লাবোরাতোরিতে (দ্য রিডিসকভার্ড ইমেজ ল্যাবরেটরি) নিয়ে ফোরকে সংস্করণে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রয়াত ভারতীয় নির্মাতা জন অ্যাব্রাহাম পরিচালিত ‘আম্মা আরিয়ান’ ছিল একটি নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র। এর গল্প এক তরুণ নকশালের মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তার মাকে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর জানাতে গ্রামে যায় বন্ধুরা।
‘আম্মা আরিয়ান’কে একটি জটিল চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় একটি নিরীক্ষা। বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা বিন্দুমাত্র না ভেবেই ছবিটি নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর মুক্তির পর সমালোচকেরা এর গল্পে একাধিক অর্থবহ স্তর খুঁজে পান। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সর্বকালের সেরা ১০টি ভারতীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পাওয়া একমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় ছবি এটাই।
পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় (এফটিআইআই) চিত্রনাট্য ও পরিচালনা বিষয়ে পড়াশোনার সময় ঋত্বিক ঘটক ও মনি কৌলের সান্নিধ্য পান জন অ্যাব্রাহাম। এফটিআইআই থেকে স্বর্ণপদক জিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। মনি কৌল পরিচালিত হিন্দি ছবি ‘উসকি রুটি’র (১৯৬৯) মাধ্যমে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র আঙিনায় পা রাখেন জন অ্যাব্রাহাম। ‘আম্মা আরিয়ান’ ছিল তার চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এটি মুক্তির পরের বছর, ১৯৮৭ সালের ৩১ মে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
কান ক্ল্যাসিকস শুরুর গল্প
প্রায় কুড়ি বছর আগে, ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্থানের ফলে সমকালীন চলচ্চিত্র রূপান্তরিত হওয়ার সময় ‘কান ক্ল্যাসিকস’ বিভাগ চালু করা হয়। বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক কাজ প্রদর্শন করা হয়ে থাকে এতে। বর্তমানে এটি অফিশিয়াল সিলেকশনের একটি অপরিহার্য অংশ। উৎসবে ধ্রুপদি চলচ্চিত্রগুলোর পুনরুদ্ধারকৃত প্রিন্টের পাশাপাশি সেগুলোর ইতিহাস-সম্পর্কিত প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করছেন আয়োজকেরা। বিশ্বজুড়ে এখন পুনরুদ্ধারের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। এর ফলে বর্তমান সময়ের ছায়ায় সোনালি দিনের সাদা-কালো চলচ্চিত্র নতুনভাবে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাচ্ছে। কান ক্লাসিকসে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর পাশাপাশি বড় পর্দায় ফিরে আসা মূল্যবান দুর্লভ চলচ্চিত্রগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। ফিকশন ও ডকুমেন্টারির সমন্বয়ে এই প্রাণবন্ত আয়োজন বুনুয়েল থিয়েটার, আনিয়েস ভার্দা থিয়েটার এবং সিনেমা দ্যু লা প্লাশে দেখানো হবে।
২০২৬ সালের কান ক্লাসিকসে থাকছে উদযাপনমূলক চলচ্চিত্র, পরিমার্জিত সংস্করণ এবং প্রামাণ্যচিত্র। এরমধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ২২টি, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ৩টি এবং প্রামাণ্যচিত্র ৬টি। এছাড়া এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দুটি সমকালীন কাজ। সদ্যপ্রয়াত আমেরিকান শিল্প নির্দেশক ডিন টাভুলারিসের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করা হবে এবারের সংস্করণ।
পুনরুদ্ধার করা অন্য ছবিগুলো হলো: আর্মেনিয়ার আরতাভাস্ত পেলেহিয়ান পরিচালিত ‘ল্যান্ড অব দ্য পিপল, দ্য বিগিনিং, উই, দি ইনহ্যাবিট্যান্টস, সিজনস’ (১৯৬৬-১৯৭৫), ফ্রান্সের আন্দ্রে মালরো পরিচালিত ‘ইসপোয়ার’ (১৯৩৮), হংকংয়র চেন কায়গা পরিচালিত ‘ফেয়ারওয়েল মাই কনকিউবাইন’ (১৯৯৩), ইতালির জিউসেপ্পে প্যাট্রোনি গ্রিফি পরিচালিত ‘লাভ সার্কেল’ (১৯৬৮), ইয়েজে স্কলিমস্কির ‘মুনলাইটিং’ (১৯৮২),জাপানের আকিরা কুরোসাওয়ার ‘সুগাতা সানশিরো’ (১৯৪৩), যুক্তরাষ্ট্রের অরসন ওয়েলেসের ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ (১৯৪৬), ফ্রান্সের জ্যঁ দ্যুলানোয়া পরিচালিত ‘পাস্টোরাল সিম্ফোনি’ (১৯৪৬), গ্রিসের মারিয়া প্লিতার ‘ইভ’ (১৯৫৩), বেলজিয়ামের রিক কায়বার্স, রোলান্ড ভারহাভার্ট ও ইফো মিফিলস পরিচালিত ‘সিগালস ডাই ইন দ্য হারবার’ (১৯৫৫), আর্জেন্টিনার লিওপোলডো তোরে নিলসন পরিচালিত ‘দ্য হাউস অব অ্যাঞ্জেল’ (১৯৫৭), যুক্তরাষ্ট্রের রজার কোরম্যান পরিচালিত ‘মেশিন গান কেলি’ (১৯৫৮), ইতালির ভিত্তোরিও দে সিকার ‘টু উইমেন’ (১৯৬০), ফ্রান্সের পলা দেলসোল পরিচালিত ‘দ্য ড্রিফট’ (১৯৬৪), যুক্তরাষ্ট্রের কেন রাসেলের ‘দ্য ডেভিলস’ (১৯৭১),ইতালির লুকিনো ভিসকন্তির ‘দ্য ইনোসেন্ট’ (১৯৭৬), পোল্যান্ডের আন্দ্রেই ভাইদা পরিচালিত ‘ম্যান অব আয়রন’ (১৯৮১), তাইওয়ানের ইয়াং লি-কুয়ো পরিচালিত ‘দ্য ডাল-আইস ফ্লাওয়ার’ (১৯৮৯), বুরকিনা ফাসোর ইদ্রিসা ওয়েদ্রাওগো পরিচালিত ‘তিলাই’ (১৯৯০)।
উৎসবে বলিউডের জৌলুস
চলচ্চিত্র ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উদযাপনের জন্য পরিচিত কানের বিশ্ববিখ্যাত লালগালিচায় ভারতের বেশ কয়েকজন তারকা অংশ নেবেন। তাদের মধ্যে প্রথমবার কানসৈকতে পা রাখবেন অভিনেত্রী তারা সুতারিয়া। আশা করা হচ্ছে, রেড কার্পেটে জমকালো অভিষেক হবে তার। ফরাসি উপকূলীয় শহরে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে তারা সুতারিয়া কী পরবেন, সেটি দেখার জন্য ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
আন্তর্জাতিক পরিচিতি প্রত্যাশী শিল্পীদের জন্য কান উৎসব একটি লোভনীয় মঞ্চ। প্রতি বছর ভারত থেকে বেশ কয়েকজন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে যোগ দেন এবং রেড কার্পেটে হাঁটেন। এরই ধারাবাহিকতায় লরিয়াল প্যারিসের তিন দূত ঐশ্বরিয়া রাই, আলিয়া ভাট ও অদিতি রাও হায়দারির পাশাপাশি জ্যাকলিন ফার্নান্দেজ, মৌনি রয়, পূজা বাত্রা, কল্যাণী প্রিয়দর্শন, করণ জোহর, মনীষ মালহোত্রা, আশুতোষ গোয়াড়িকার, মিসেস ইউনিভার্স শেরি সিং হাজির হবেন কানের লালগালিচায়। কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক উৎসবটিতে নিয়মিত উপস্থিত থাকা এই অভিনেত্রীরা এবারের ফ্রান্স যাত্রার আগে নিজেদের বিভিন্ন সাজ চূড়ান্ত করে নিচ্ছেন। এছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাতা পায়েল কাপাডিয়া ৬৫তম কান ক্রিটিকস’ উইকের জুরি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আগামী ১২ মে সাগরপাড়ের শহর কানের পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে উৎসবটির পর্দা উঠবে। ৭৯তম আসর চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করবেন ফরাসি অভিনেত্রী আই আইদারা।




