ঋতুপর্ণ ঘোষের চলে যাওয়ার দিন আজ

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই নামগুলোর অন্যতম ঋতুপর্ণ ঘোষ। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৩ সালের ৩০ মে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, সাহসী চিন্তা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, সমানভাবে আলোচিত।
ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, উপস্থাপক, লেখক এবং একাধারে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলা সিনেমাকে নতুন ভাষা, নতুন নন্দনচেতনা এবং নতুন দর্শক উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৯২ সালে ‘হীরের আংটি’ চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক হলেও তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন ‘উনিশে এপ্রিল’ নির্মাণের পর
১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে ‘হীরের আংটি’ চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক হলেও তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন ‘উনিশে এপ্রিল’ নির্মাণের পর। মা-মেয়ের সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এবং বাংলা সিনেমায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে।
এরপর একে একে তিনি উপহার দেন ‘দহন’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘উৎসব’, ‘অসুখ’, ‘চোখের বালি’, ‘রেইনকোট’, ‘দোসর’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘আবহমান’, ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো প্রশংসিত চলচ্চিত্র। তাঁর সিনেমার প্রধান শক্তি ছিল মানুষের অন্তর্জগৎ, সম্পর্কের জটিলতা এবং আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ।
বিশেষ করে নারীকেন্দ্রিক গল্প নির্মাণে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন অনন্য। তাঁর চলচ্চিত্রে নারীরা শুধু গল্পের অংশ নয়, বরং গল্পের চালিকাশক্তি। সমাজ, পরিবার, প্রেম, একাকীত্ব এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে তিনি এমন সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল।
দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে লিঙ্গ ও পরিচয়বিষয়ক আলোচনায় তিনি হয়ে ওঠেন এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর
ঋতুপর্ণ ঘোষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল লিঙ্গপরিচয় ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে সামাজিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। জীবনের শেষ পর্বে তিনি নিজের অবস্থান এবং ভাবনাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে লিঙ্গ ও পরিচয়বিষয়ক আলোচনায় তিনি হয়ে ওঠেন এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর।
তাঁর কাজ শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। কর্মজীবনে তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর চলচ্চিত্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্রের এই ক্ষণজন্মা স্রষ্টাকে নতুন করে স্মরণ করছে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু মানুষের সম্পর্ক, আবেগ এবং অস্তিত্বের যে গল্প ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।






