ঐশ্বরিয়ার ছবি তুলে বিপাকে সাংবাদিক, এগিয়ে আসেন ঋতুপর্ণ

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধু তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দক্ষতার জন্যই নয়, শিল্পী ও সহকর্মীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কের জন্যও স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে কলকাতার প্রবীণ চিত্রসাংবাদিক অশোক মজুমদার স্মরণ করেছেন ‘চোখের বালি’ সিনেমার শুটিংয়ের এক বিশেষ অভিজ্ঞতা, যেখানে ফুটে উঠেছে ঋতুপর্ণ ঘোষের পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের প্রতি আস্থা।
২০০২ সালের শেষ দিকে ‘চোখের বালি’ সিনেমার শুটিং চলছিল কলকাতায়। সিনেমাটিতে অভিনয় করছিলেন বলিউড তারকা ঐশ্বরিয়া রাই। সে সময় শুটিং সেটে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। কলকাতার কোনো সংবাদমাধ্যমই অভিনেত্রীর একটি ছবিও সংগ্রহ করতে পারেনি।
অশোক মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণায় জানান, দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সুবাদে তিনি বারবার ঋতুপর্ণ ঘোষকে অনুরোধ করতেন যেন শুটিংয়ের কিছু ছবি তোলার সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত নির্মাতা তাঁকে নির্দিষ্ট দিনে শুটিং সেটে আসার অনুমতি দেন। তবে শর্ত ছিল, আগে ঐশ্বর্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, এরপর ছবি তোলা যাবে।
কিন্তু শুটিং শুরুর আগেই দূর থেকে ঐশ্বররিয়ার কয়েকটি ছবি তুলে ফেলেন অশোক। বিষয়টি নজরে আসে অভিনেত্রীর নিরাপত্তা দলের। এতে শুটিং সাময়িকভাবে থমকে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেই এগিয়ে যান ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সঙ্গে অশোক মজুমদারের পরিচয় করিয়ে দেন এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পরে শুটিং স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়। শুধু তাই নয়, ধীরে ধীরে ঐশ্বরিয়ার সঙ্গেও সাংবাদিকের পেশাদার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুটিং চলাকালে অভিনেত্রী নিয়মিত তাঁর তোলা স্থিরচিত্র দেখতেন বলেও স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন অশোক।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উঠে আসে। তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক মানের তারকাদের সঙ্গে কাজ করতেন, অন্যদিকে সহকর্মী ও সংবাদকর্মীদের প্রতিও রাখতেন আস্থা ও সম্মান। পেশাদারিত্ব বজায় রেখেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
অশোক মজুমদারের ভাষ্য, ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন এমন একজন নির্মাতা, যিনি শিল্পী, অভিনেতা, সাংবাদিক সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন। তাঁর বাড়িতে যাতায়াত ছিল অনেকের জন্যই উন্মুক্ত। কাজের ফাঁকে ফটোগ্রাফি নিয়েও আলোচনা করতেন তিনি এবং অন্যের মতামতকেও গুরুত্ব দিতেন।
স্মৃতিচারণার শেষাংশে অশোক মজুমদার উল্লেখ করেন, সত্যজিৎ রায়ের পর বাংলা চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো প্রতিভাবান নির্মাতা খুব কমই দেখা গেছে। তাঁর মতে, আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে ভারতীয় ও বিশ্ব চলচ্চিত্রকে আরও অনেক অসাধারণ কাজ উপহার দিতে পারতেন এই নির্মাতা।
২০১৩ সালের ৩০ মে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তবে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, শিল্পবোধ এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা এখনও সমানভাবে স্মরণ করেন সহকর্মী, শিল্পী ও দর্শকরা। অশোক মজুমদারের এই স্মৃতিচারণও যেন সেই মানবিক ও মেধাবী ঋতুপর্ণ ঘোষকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।







