বাংলার শেষ ‘পুরুষ রানি’ চপল ভাদুড়ীর উত্থান-পতনের বিষাদময় উপাখ্যান

বাংলার ভ্রাম্যমাণ লোকনাট্য যাত্রার মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী ছিলেন চপল ভাদুড়ী
বিংশ শতাব্দীর মাঝের দিকের কথা। ওপার বাংলার যাত্রা মঞ্চ তখন কাঁপছে একঝাঁক নারী তারকার দাপটে। তাদের রূপের ছটায় মুগ্ধ হাজার হাজার দর্শক। কিন্তু পর্দার পেছনের রহস্যটা ছিল অন্যরকম। মঞ্চে যাদের দেখে দর্শক শিস দিত কিংবা চোখের জল ফেলত, তাদের অনেকেই ছিলেন আসলে পুরুষ। সেই ‘পুরুষ রানি’দের রাজত্বে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নাম ছিল চপল ভাদুড়ী, যাকে দুনিয়া চিনত ‘চপল রানি’ নামে।
সম্প্রতি লেখক সন্দীপ রায়ের বই ‘চপল রানি: দ্য লাস্ট কুইন অফ বেঙ্গল’ বইটিতে এই কিংবদন্তি অভিনেতার জীবনের অলিগলি উঠে এসেছে। উঠে এসেছে এক অদ্ভুত জাদুর দুনিয়ার গল্প, যেখানে লৈঙ্গিক পরিচয় ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছিল অভিনয়।বাংলার গ্রামীণ জনপদে তখন বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল যাত্রা। খোলা মঞ্চ, চড়া মেকআপ আর উঁচু গলার সংলাপ সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। যাত্রার সেই সোনালি সময়ে মেয়েদের মঞ্চে নামা ছিল সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই আবির্ভাব ঘটেছিল পুরুষ রানিদের। চপল ভাদুড়ী ছিলেন সেই ধারার অবিসংবাদিত সম্রাট।
১৯৩৯ সালে উত্তর কলকাতায় জন্ম নেওয়া চপলের রক্তেই ছিল অভিনয়। মা প্রভা দেবী ছিলেন প্রখ্যাত মঞ্চ অভিনেত্রী। চপলের গড়ন ছিল খানিকটা ছিপছিপে, গলার স্বরও ছিল মোলায়েম। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন তিনি শাড়ি পরে মঞ্চে দাঁড়ালেন, মানুষ যেন পলক ফেলতে ভুলে গেল।
নিজের রূপ ধরে রাখতে চপল যে পরিশ্রম করতেন, তা আজকের যুগের নায়িকাদেরও হার মানাবে। বক্ষদেশের অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে শুরুতে ন্যাকড়া, পরে স্পঞ্জ ব্যবহার করতেন। নিখুঁত মেকআপ আর শাড়ির ভাঁজে তিনি যখন মঞ্চে আসতেন, বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি কোনো পুরুষ। দেবী শীতলা থেকে শুরু করে পতিতা সব চরিত্রেই তিনি ছিলেন অনবদ্য।মঞ্চের বাইরে চপল ভাদুড়ীর জীবনটা ছিল বেশ জটিল। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নিজের মনের কথা খুলে বলা ছিল দায়। তিনি কখনও সরাসরি নিজেকে সমকামী বলে পরিচয় দেননি, কিন্তু তার জীবনে প্রেম এসেছিল বারবার।
অসংখ্য ভক্ত তাকে প্রণয় নিবেদন করত। চপল গর্বের সাথে বলতেন, ‘ভালোবাসার জন্য আমি লজ্জিত নই, ক্ষমা চাইবার তো প্রশ্নই আসে না।’ এক দম্পতির সাথে তার দীর্ঘ ৩০ বছরের এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। অনেকটা গৃহকর্মীর মতোই তাদের সংসারে কাটিয়েছেন তিনি, পাননি কোনো সামাজিক স্বীকৃতি।সময়ের সাথে সাথে রুচি বদলালো। যাত্রার মঞ্চে সরাসরি নারীরা অভিনয় শুরু করলেন। সত্তরের দশকে দর্শক আর ‘পুরুষ রানি’দের গ্রহণ করতে পারছিল না। একদিন এক অনুষ্ঠানে বয়স্ক নারী চরিত্রে অভিনয় করতে নেমেছিলেন চপল। দর্শক তাকে দেখে বিদ্রূপ শুরু করে, এক পর্যায়ে মঞ্চ লক্ষ্য করে ছুড়ে মারা হয় মাটির ভাঁড়।
সেই এক আঘাতেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল চপল রানির সাম্রাজ্যর। অনেক সমসাময়িক শিল্পী চরম দারিদ্র্যে দিন কাটিয়েছেন। কেউ দর্জি হয়েছেন, কেউ বাদাম বিক্রি করেছেন, এমনকি কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ।
ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় চপলকে বেঁচে থাকতে হয়েছে চরম সংগ্রাম করে। লাইব্রেরি ঝাড়ু দেওয়ার কাজ পর্যন্ত করেছেন তিনি। এমনকি পেটের দায়ে শীতলা দেবীর বেশ ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন আশীর্বাদের বিনিময়ে দু-চার আনা পয়সা আর চাল-ডালের আশায়। যে মানুষটি একসময় হাজারো মানুষের করতালি পেতেন, তাকে দেখা গেল রাস্তার ধুলোয়।নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলি এবং প্রকাশক নবীন কিশোরের মাধ্যমে চপল ভাদুড়ী আবার আলোচনায় আসেন। আজকের প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন এক ‘ক্যুইয়ার আইকন’। অনেকে তাকে ‘ফেয়ারি গডমাদার’ বলে ডাকতে শুরু করেন। তবে চপল নিজে কোনো তকমা বা লেবেলে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন, মেকআপ মুছে ফেললে তিনি স্রেফ একজন সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালি পুরুষ।
বর্তমানে এই কিংবদন্তি শিল্পী কলকাতার এক বৃদ্ধাশ্রমে শেষ দিনগুলো পার করছেন। তার পৈতৃক বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরেই তার অবস্থান, কিন্তু সেই বাড়ির দরজা তার জন্য বন্ধ। বার্ধক্য আর রোগশোকের সাথে লড়াই করতে করতে এখন কেবল পুরনো দিনের স্মৃতিই তার সম্বল।চপল ভাদুড়ীর গল্পটি কেবল একজন অভিনেতার উত্থান-পতনের নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের করুণ আখ্যান। আজ যখন আমরা জেন্ডার ফ্লুইডিটি বা লিঙ্গ বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলি, চপল ভাদুড়ী তখন নীরবে মনে করিয়ে দেন তিনি এই লড়াইটা লড়েছিলেন বহু বছর আগে, কোনো ব্যানার ছাড়াই।
চপল ভাদুড়ী কি কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন? নাকি এক অদৃশ্য জেন্ডার বিপ্লবের অগ্রপথিক? ইতিহাস হয়তো তাকে মনে রাখবে ‘বাংলার শেষ রানি’ হিসেবেই।















