জাপানি গার্ল ব্যান্ড এক্সজির উত্থানের গল্প

গার্ল গ্রুপ ‘এক্সজি’
এশিয়ান পপ মিউজিক বললেই চলে আসে কে-পপের নাম। এই ধারা চলছে গত এক দশক ধরে। কোরিয়ার শিল্পীদের গানে-নাচে মানুষ এতটাই মুগ্ধ যে অন্যদিকে চোখ ফেরানোই যেন দায়! কিন্তু সেই ধারায় ছেদ ঘটাতে এসেছে এক দল জাপানি নারী। ‘এক্সজি’ নামের এ গার্ল গ্রুপ এখন টেক্কা দিচ্ছে কে-পপকে।
যদিও জাপানি আইডল কালচার বা জে-পপ বরাবরই নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পছন্দ করত। কিন্তু ২০২২ সালে হিপ-হপ, ট্র্যাপ এবং নব্বই দশকের আরঅ্যান্ডবির বিস্ফোরক ককটেল নিয়ে সেই ধারা ভেঙে দিয়েছে গার্ল গ্রুপটি।
২০২৬ সালের জুনে এসে, তাদের নতুন অ্যালবাম ‘দ্য কোর’ এবং কোচেলার একমাত্র জাপানি লাইন-আপ হওয়া প্রমাণ করে, এক্সজি এখন বিশ্ব পপ কালচারের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।
এক্সজির গল্পটা যতটা গ্ল্যামারাস, এর পেছনের অন্ধকার অতীত ততটাই যন্ত্রণাদায়ক। সাত সদস্য নিয়ে তৈরি এক্সজি ব্যান্ড। মায়া, জুরিয়া, হিনাতা, হার্ভে, কোকোনা, চিসা এবং জুরিন এই দলের সদস্য। ২০১৬ সালে মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে জাপানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন এই মেয়েদের বেছে নেওয়া হয়েছিল, তখন তারা জানত না তাদের কীসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ডরমিটরিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা, অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অনবরত স্কোয়াটস এবং ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর নাচ-গানের সেশন— যা মায়ার ভাষায় ছিল ‘নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ’।
তবে এই চরম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তাদের একে অপরের শত্রু বানায়নি, বরং তৈরি করেছে ‘হেসোনো-ও’ বা আম্বিলিক্যাল কর্ডের মতো এক অবিচ্ছেদ্য পারিবারিক বন্ধন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যান্ডের সবচেয়ে ছোট সদস্য কোকোনার নিজেকে ‘ট্রান্সম্যাসকুলিন’ ও ‘নন-বাইনারি’ হিসেবে প্রকাশ করাটা এশিয়ান মিউজিক হিস্ট্রির অন্যতম সবচেয়ে সাহসী ও ঐতিহাসিক ঘটনা।
কে-পপ বা জে-পপ এজেন্সিগুলো যেখানে শিল্পীদের লিঙ্গ পরিচয়, ডেটিং জীবন এবং পোশাক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে এক্সজির প্যারেন্ট কোম্পানি এবং ব্যান্ডমেটরা কোকোনাকে যেভাবে আগলে রেখেছেন তা অতুলনীয়।
ব্যান্ডের নাম ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি গার্লস’ থেকে বদলে ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি জিন্স’ করা এবং অ্যালবামে ‘ও.আর.বি’-এর মতো ব্রো-সলিডারিটি রক ট্র্যাক রাখা প্রমাণ করে এক্সজি কেবল গান গায় না, তারা বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির এক বৈশ্বিক মেনিফেস্টো।
এক্সজির মিউজিকাল গ্র্যাভিটি বা আকর্ষণ অন্য সবার চেয়ে আলাদা হওয়ার মূল কারণ হলো তাদের ত্রৈভাষিক ক্ষমতা। তারা জাপানি হওয়া সত্ত্বেও মূলত ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষায় পারফর্ম করে গ্লোবাল অডিয়েন্সকে টার্গেট করেছে।
‘গালজ সাইফার’-এর সেই ভাইরাল র্যাপ সাইফারে জুরিন, মায়া, হার্ভে এবং কোকোনার গতি দেখে স্বয়ং আমেরিকান হিপ-হপ লিজেন্ডরাও প্রশংসা করেছিলেন। নতুন সিঙ্গেল ‘হিপনোটাইজ’-এর ওল্ড-স্কুল হাউজ পিয়ানো বিট ইতিমধ্যেই ২০২৬-এর সামার চার্ট কাপানো শুরু করেছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েম্বলি অ্যারেনায় যখন এই সাত তারকা পা রাখবেন, তখন তা কেবল একটি কনসার্ট হবে না, তা হবে ৬ বছরের অশ্রু, কোকোনার নিজের সত্যকে মেনে নেওয়ার সাহসিকতা এবং সংস্কৃতির দেয়াল ভেঙে দেওয়ার এক মহাকাব্যিক উদযাপন।





