কে-পপে তোলপাড়, কী এই রহস্যময় ‘হাইব অভিশাপ’?

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বজুড়ে কে-পপ গানের কোটি কোটি শ্রোতাদের মাঝে আজকাল প্রায়ই এক আজব ও রহস্যময় আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। আপনার প্রিয় ব্যান্ডের কোন তারকারা আজ হয়তো নতুন গান দিয়ে কোনো বিশ্বরেকর্ড ভাঙছে, তো ঠিক পরের দিনই তারা হুট করে কোনো নোংরা আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক নামী তারকাকে আবার দল থেকে কোন কারণ ছাড়াই বের করে দেওয়া হচ্ছে, কিংবা তারা খবরের শিরোনাম হচ্ছেন কোন কেলেঙ্কারির কারণে। সাধারণ দর্শকেরা এগুলোকে স্রেফ কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দিলেও খ্যাপাটে ভক্তদের এক বড় অংশ কিন্তু এই যুক্তি মোটেও বিশ্বাস করছে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক বিনোদন কোম্পানি ‘হাইব কোং লিমিটেড’ যে বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর বিনোদন সাম্রাজ্য, তা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে। বিগহিট মিউজিক, প্লেডিস এন্টারটেইনমেন্ট, অ্যাডোর এবং বিলিফট ল্যাবের মতো নামী রেকর্ড লেবেলগুলো মূলত এই হাইবের অধীনেই বিশ্ব কাঁপানো সব পপ তারকাদের জন্ম দিয়েছে। তবে ইদানীং একের পর এক বড় বড় কেলেঙ্কারি, তারকাদের আকস্মিক দলত্যাগ এবং কর্পোরেট ঝামেলার কারণে ভক্তরা হাইবের নামের সাথে এক আজব তকমা জুড়ে দিয়েছেন, যাকে তারা রসিয়ে রসিয়ে ডাকছেন ‘হাইব কার্স’ বা ‘হাইব অভিশাপ’ নামে।
ইন্টারনেটের দুনিয়ায় রেডিট থেকে শুরু করে এক্স, সব জায়গার কে-পপ গ্রুপগুলোতে ভক্তরা এখন এই নতুন তত্ত্ব নিয়ে দিনরাত চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। ভক্তরা এখন মনে মনে চরম প্রার্থনা করছে যেন তাদের প্রিয় নতুন ব্যান্ডের ওপর এই অভিশাপের কালো নজর না পড়ে।
এই তত্ত্বটি আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঝামেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। বরং ভক্তরা সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করেছে যে, হাইবের অধীনে থাকা যেকোনো নতুন গ্রুপ বাজারে এসে তুমুল সাফল্য পাওয়ার ঠিক পরপরই কোনো না কোনো বড় বিতর্ক, আইনি ঝামেলা, মেম্বারদের বিদায় কিংবা ক্যারিয়ারে মস্ত বড় ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে। এই অদ্ভুত ও ধ্রুবক মিলটিকেই ভক্তরা এখন একবাক্যে ‘হাইব কার্স’ বা হাইবের অভিশাপ বলে দুনিয়াময় রটাচ্ছে।
বিগহিট এন্টারটেইনমেন্ট নাম থাকা অবস্থায় ২০১২ সালে তারা ‘সোর্স মিউজিক’ লেবেলের সাথে যৌথভাবে ‘গ্ল্যাম’ নামের তাদের প্রথম গার্ল ব্যান্ড বাজারে এনেছিল। দাহি, মিসো, পার্ক জি-ইয়ন, জিন্নী এবং ট্রিনিটি নামের পাঁচ সদস্যের এই ব্যান্ডটি সে সময় তরুণদের মাঝে দারুণ সাড়াও ফেলেছিল। তবে ২০১৪ সালে ব্যান্ডের সদস্য দাহি এক হাই-প্রোফাইল কোরিয়ান অভিনেতাকে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে এই ব্যান্ডের সাফল্যে হঠাৎ করে এক মস্ত বড় তালা পড়ে যায়। ২০১৫ সালে গ্ল্যাম ব্যান্ডটি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার পর বিগহিট বর্তমান হাইব প্রায় এক দশক ধরে কোনো মেয়েদের ব্যান্ড তৈরি করা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিল এবং কেবল ‘বিটিএস’-এর মতো বয় ব্যান্ডের ওপর নজর দেওয়ায় নারী ভক্তদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছিল তারা।
বিতর্কের আগুন এখানেই কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তীতে হাইব যখন ‘সোর্স মিউজিক’ কোম্পানিটি চড়া দামে কিনে নেয়, তখন ২০২১ সালে তাদের জনপ্রিয় গার্ল গ্রুপ ‘জিফ্রেন্ড’ হুট করে ভেঙে যাওয়ায় ভক্তদের মনে কর্পোরেট ষড়যন্ত্রের সন্দেহ আরও নতুন করে দানা বাঁধে। এর পরের বছরগুলোতেও হাইবের বিভিন্ন মেয়েদের গ্রুপ থেকে মেম্বারদের আকস্মিক বিদায় এই অনলাইন বিতর্ককে আরও বেশি উস্কে দেয়; যেমন ২০২২ সালে অভিষেকের পরপরই ‘লে সেরাফিম’ থেকে কিম গা-রামের বিদায় এবং ২০২৪ সালে অভিষেকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ‘ইলিট’ ব্যান্ড থেকে ইয়ংসিও-র আকস্মিক প্রস্থান ভক্তদের মনে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
হাইব অভিশাপের সবচেয়ে বড় এবং জ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে ভক্তরা বর্তমানে ‘নিউজিন্স’ বনাম তাদের নিজস্ব এজেন্সি ‘অ্যাডোর’-এর মধ্যকার আইনি লড়াইকে সামনে আনছে। ২০২৪ সালে ব্যান্ডের সদস্যরা এজেন্সির বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিলে এই বিশাল ফাটল সবার সামনে আসে।
পুরো ঝামেলার সূত্রপাত ঘটে যখন হাইব কর্তৃপক্ষ অ্যাডোরের তৎকালীন সিইও মিন হি-জিনকে কোম্পানি দখল করার চতুর চেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করে। জবাবে মিন হি-জিন দাবি করেন যে হাইব তার সাথে বড্ড খারাপ ব্যবহার করেছে এবং নিউজিন্স ব্যান্ডকে চরম অপমান করেছে, যা পরবর্তীতে এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের রূপ নেয়। নিউজিন্সের মেয়েরা তাদের মেন্টর মিন হি-জিনের পাশে দাঁড়িয়ে অ্যাডোরের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনে এবং পরবর্তীতে ‘এনজেড’ নামে স্বাধীনভাবে কাজ করার ঘোষণা দেয়। তবে অ্যাডোরও দমে না গিয়ে চুক্তির বৈধতা নিয়ে মেয়েদের বিরুদ্ধে আদালতে মস্ত বড় এক মামলা ঠুকে দিয়েছে।
জেনারেশন-জেড বা এই যুগের তরুণদের ক্রেজ ‘এনহাইপেন’ ব্যান্ড থেকে হিসুংয়ের বিদায় নেওয়ার ঘটনাটিও হাইব অভিশাপের আগুনে ব্যাপক ঘি ঢেলেছিল। হিসুং (যিনি এখন ইভান নামে পরিচিত) যখন এই জনপ্রিয় ব্যান্ডটি ছেড়ে চলে যান, তখন ইন্টারনেট জুড়ে ভক্তরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং তাদের প্রিয় ‘বাম্বি’ বা হীসুংয়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য তারা হাইব ও তার সাব-লেবেল ‘বিলিফট ল্যাব’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করান।
বিশ্বের প্রায় ২০০টিরও বেশি দেশের ভক্তরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনলাইনে পিটিশন সই করেন, রাস্তায় নেমে ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘#ENHYPENis7’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে এক বিশাল ঝড় তোলেন।
হাইবের সবচেয়ে বড় সোনার ডিম পাড়া হাঁস এবং তাদের বিশ্বজয়ের মূল কারিগর ‘বিটিএস’-এর সদস্যরাও কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় ইন্টারনেটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। বছরের পর বছর ধরে ব্যান্ডের সদস্যরা ক্যারিয়ারের মানসিক চাপ এবং ম্যানেজমেন্টের আচরণ নিয়ে ক্যামেরার সামনে মুখ খুলেছেন।
এক লাইভস্ট্রিমে ব্যান্ডের লিডার আরএম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি আশা করি আমাদের কোম্পানি আমাদের প্রতি আরেকটু ভালোবাসা দেখাবে এবং আমাদের আরেকটু আন্তরিকতার সাথে আগলে রাখবে।’ এমনকি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এই ব্যান্ডের পর্দার পেছনের এক ডকুমেন্টারিতেও ম্যানেজমেন্টের সাথে বিটিএস মেম্বারদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনার মস্ত বড় অমিল বা দূরত্বের কথা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, যা ভক্তদের মনে গভীর চিন্তার রেখা এঁকে দিয়েছে।
হাইবের নতুন গ্লোবাল গার্ল পপ ব্যান্ড ‘ক্যাটসাই’-কেও ভক্তরা এখন এই অদ্ভুত অভিশাপের তালিকায় জুড়ে দিচ্ছেন। ‘গ্যাব্রিয়েলা’, ‘নার্লি’ এবং ‘টাচ’-এর মতো একের পর এক ভাইরাল গান উপহার দিয়ে ব্যান্ডটি যখন বিশ্বজুড়ে দারুণ ব্যবসা করছে, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যান্ডের জনপ্রিয় সদস্য ম্যানন অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরতিতে চলে যান।
এই আকস্মিক ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নেটিজেনরা সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইবকে ধুয়ে দিচ্ছেন এবং বলছেন যে এটিই হলো হাইব অভিশাপের সর্বশেষ প্রমাণ। অবশ্য অনেক ঠান্ডা মাথার বিনোদন বিশেষজ্ঞ আবার উল্টো যুক্তি দিয়ে বলছেন যে, হাইবের অধীনে অনেকগুলো আলাদা আলাদা লেবেল স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং এই ঘটনাগুলোর পেছনে একেকটার ভিন্ন ভিন্ন বাস্তব কারণ রয়েছে। তাই সব কিছুকে স্রেফ একটা ‘অন্ধবিশ্বাসের অভিশাপ’ বলে এক পাত্রে গোলানো মোটেও ঠিক নয়।









