বাস্তব জীবনের গল্পে নির্মিত সেরা ১০ বায়োপিক

সংগৃহীত ছবি
বিখ্যাত ব্যক্তিদের অজানা জীবন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সবসময় একটু বেশিই থাকে। তাই পরিচালকরাও এই ধরনের সিনেমা নির্মাণ করে থাকেন। একটি মানুষের জীবনের সত্য ঘটনাকে রূপালী পর্দায় ফুটিয়ে তোলা পরিচালকদের জন্য বড্ড সহজ মনে হলেও কাজটি মোটেও সহজ নয়। এই সিনেমাগুলো দুনিয়ার সংগীতশিল্পী, নামী কর্মী, চিত্রশিল্পী কিংবা নামজাদা খেলোয়াড়দের উত্থান-পতনের এক চমৎকার জানালা আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরে। ইতিহাস বইয়ের চেনা অক্ষরের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী উপায়ে এই ছবিগুলো দর্শকদের সরাসরি চরিত্রের সাথে যুক্ত করে। সিনেমা ইতিহাসের তেমনই সেরা ১০টি কালজয়ী বায়োপিকের এক তালিকা নিয়ে কথা বলব আজ।
১০. ভাইস (২০১৮)
আমেরিকার রাজনীতিতে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তব জীবনের এক মস্ত বড় খলনায়ক ডিক চেনির গল্প নিয়ে এই সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। বুশ আমলের এই ক্ষমতাধর ভাইস প্রেসিডেন্টের মনস্তত্ত্ব ও কুটিল বুদ্ধি কীভাবে পুরো পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দিয়েছিল, পরিচালক সেই গম্ভীর বিষয়টিই এখানে হাসির ছলে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ছবিতে অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেল নিজের ফুসফুস দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এক অবিশ্বাস্য অভিনয় দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। চেনির চরিত্রে বেলের সেই চতুর পরিকল্পনা করার আগের ভয়ঙ্কর শ্বাস নেওয়ার শব্দ কিংবা হতাশার দীর্ঘশ্বাসগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলে তা যেকোনো মানুষের গায়ের লোম খাড়া করে দেয়। এছাড়া বুশ হিসেবে স্যাম রকওয়েলও পর্দায় দুর্দান্ত এক অভিনয় দেখিয়েছেন।
৯. ম্যালকম এক্স (১৯৯২)
আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও খ্যাপাটে বিদ্রোহী নেতা ম্যালকম এক্স-এর জীবনী নিয়ে এই ছবিটি বাজারে এসেছিল। বিখ্যাত পরিচালক স্পাইক লি এবং অভিনেতা ডেনজেল ওয়াশিংটন যখন এই ঐতিহাসিক গল্প বলতে একসাথে হাত মেলান, তখন পর্দা জুড়ে এক জাদুকরী ধামাকা সৃষ্টি হয়। অভিনেতা ওয়াশিংটন এখানে ম্যালকম এক্স-এর বক্তৃতার সেই নির্মম ক্ষোভ, চটুল আকর্ষণ এবং পুরো কালো জাতিকে মুক্ত করার এক অসম লড়াইয়ের ক্লান্তি নিজের শরীরের প্রতিটি কোণ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৮. ফানি গার্ল (১৯৬৮)
বিখ্যাত গায়িকা বারবারা স্ট্রেইস্যান্ড যখন নিজের গানের ক্যারিয়ার ছেড়ে ১৯৩০-এর দশকের জনপ্রিয় নারী কৌতুক অভিনেতা ফ্যানি ব্রাইসের চরিত্রে অভিনয়ের ঘোষণা দেন, তখন অনেকেই তা বেশ বাঁকা চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর স্ট্রেইস্যান্ড নিজের দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে পুরো আড়াই ঘণ্টার ছবিটিকে একা নিজের কাঁধে টেনে নিয়ে যান। এই হাসির ছবিতে তিনি কমিক টাইমিং বা কৌতুকের সঠিক সময় ব্যবহারের এক চমৎকার পাঠ দেওয়ার পাশাপাশি চরিত্রের ভেতরের মায়াবী উষ্ণতাকেও দর্শকদের সামনে মেলে ধরেছেন।
৭. মিল্ক (২০০৮)
আমেরিকার সরকারি পদে নির্বাচিত প্রথম প্রকাশ্য সমকামী রাজনীতিবিদ ও অধিকার কর্মী হার্ভে মিল্কের চরিত্রে অভিনেতা শন পেন এক ফাটাফাটি অভিনয় উপহার দিয়েছেন। অভিনেতা শন পেন নিজের পুরো শক্তি ও ক্যারিশমা দিয়ে এই চরিত্রটিকে রূপালী পর্দায় এমনভাবে জ্যান্ত করেছেন, যা দেখলে বর্তমান যুগের পেশাদার ও কৃত্রিম রাজনীতিবিদদের কথা মনে পড়ে না। এই ছবিতে পেনের সেই হার্ভে মিল্ক চরিত্রটি যদি নিজের এলাকার একটি রাস্তার গর্ত ভরাট করার জন্যও ভাষণ দিতেন, তবে সাধারণ মানুষ তার পেছনে গিয়ে লাঠি হাতে দাঁড়াতেন।
৬. আমাডিউস (১৯৮৪)
দুনিয়ার এক মহান সংগীতশিল্পী মোৎসার্টের (টম হালস) প্রতিভা ও শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে পরিচালক এক আজব ও চমৎকার বুদ্ধি খাটিয়েছেন। মোৎসার্টের সমসাময়িক যুগের এক চরম ঈর্ষান্বিত ও হিংসুটে প্রতিদ্বন্দ্বী আন্তোনিও সালেরি (এফ. মারে আব্রাহাম)-এর চোখ দিয়ে আমরা এই ছবিতে মোৎসার্টের জীবনের পুরো গল্পটি দেখতে পাই। সালেরির সেই দৃষ্টিভঙ্গি একাধারে যেমন উত্তেজনাপূর্ণ ও হাস্যকর, তেমনই ঐতিহাসিকভাবে কিছুটা ভুল হলেও তা দর্শকদের মনে এক তীব্র আকর্ষণ তৈরি করে। দীর্ঘ সময়ের এই সিনেমাটি দেখতে বেশ লম্বা মনে হলেও তা এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি দেয়।
৫. শিন্ডলার্স লিস্ট (১৯৯৩)
একটি নৃশংস ও ভয়ঙ্কর গণহত্যার কালো ইতিহাসের মধ্যে আশার আলো খুঁজে বের করা যেকোনো মানুষের জন্যই বড্ড কঠিন এক কাজ। তবে পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ নাৎসি কারখানার মালিক অস্কার শিন্ডলার (লিয়াম নিসন)-এর সত্য কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে সেই অসম্ভব কাজটিই রূপালী পর্দায় করে দেখিয়েছেন। ইহুদি নিধনের সেই চরম মুহূর্তে শিন্ডলার নিজের কারখানার অনেক ইহুদি কর্মচারীর জীবন বাঁচিয়ে এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ছবিতে নাৎসি কর্মকর্তা আমন গোথ যেভাবে পাখি শিকারের মতো করে বন্দিদের গুলি করে মারতেন, তা নাৎসি বাহিনীর নির্মম অত্যাচারকেই পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। আর এই জঘন্য অপরাধের অন্ধকার সাগরেও শিন্ডলারের সাহসিকতা এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়িয়েছিল।
৪. দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান ( ১৯৮০)
বিখ্যাত পরিচালক ডেভিড লিঞ্চ নিজের অন্যান্য বিচিত্র ও অদ্ভুত ছবির তুলনায় ‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান’ সিনেমাটিতে গল্প একদম সহজ ও সরলভাবে সাধারণ মানুষের সামনে এনেছেন। ১৯ শতকের লন্ডনে তীব্র শারীরিক বিকৃতি নিয়ে জন্মানো জোসেফ মেরিক (যিনি এলিফ্যান্ট ম্যান নামে পরিচিত) নামের এক অবহেলিত মানুষের প্রতি পরিচালকের গভীর শ্রদ্ধা এই ছবির মূল ভিত্তি ছিল। সার্কাসে খাঁচার ভেতর বন্দি থাকা এই অসহায় মানুষের ভেতরের মর্যাদা ও আত্মসম্মানকে পরিচালক অসাধারণ সংবেদনশীলতার সাথে পুরো গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. মাই লেফট ফুট ( ১৯৮৯)
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আয়ারল্যান্ডের এক পক্ষাঘাত বা সেলেব্রাল পালসি রোগে আক্রান্ত লেখক ও চিত্রশিল্পী ক্রিস্টি ব্রাউনের জীবন নিয়ে এই সংবেদনশীল ছবিটি তৈরি হয়েছিল। নিজের এই শারীরিক অসুস্থতা ও পুরো পৃথিবীর অবহেলার বিরুদ্ধে ব্রাউনের সেই লড়াকু ও বিদ্রোহী মনোভাব একজন শিল্পী হিসেবে তাকে যেমন সফলতা দিয়েছিল, তেমনই চারপাশের মানুষের জন্য তা বেশ কঠিন ছিল। অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে-লুইস এই ছবিতে ব্রাউনের চরিত্রে যথারীতি এক অবিশ্বাস্য অভিনয় দেখিয়েছেন এবং ব্রাউনের মায়ের চরিত্রে ব্রেন্ডা ফিকারও সর্বকালের অন্যতম সেরা এক অভিনয় উপহার দিয়েছেন।
২. রেজিং বুল ( ১৯৮০)
৭০-এর দশকের বিখ্যাত মিডলওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন জেক লা মোটার জীবন নিয়ে নামী পরিচালক মার্টিন স্করসেসি এই কালজয়ী সিনেমাটি বানিয়েছিলেন। সাদা-কালোর গম্ভীর ক্যানভাসে অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো যেন এক জাদুকরী মানুষে পরিণত হয়ে বক্সিংয়ের দুনিয়ায় নিজের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তবে নিজের ভেতরের অবিরাম ক্ষোভ ও রাগই একসময় লা মোটার ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংস করে তার চরম পতন ডেকে এনেছিল। সিনেমাটি দেখা মাঝে মাঝে ভীষণ অস্বস্তিকর ও তীব্র মনে হলেও দর্শকেরা এক সেকেন্ডের জন্যও পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারেন না।
১. লরেন্স অব অ্যারাবিয়া (১৯৬২)
কিছু মানুষের বাস্তব জীবন সাধারণ রূপকথার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয় ও অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে যায়। তেমনই এক জ্বলজ্বলে চরিত্র হলেন ওয়েলসের প্রত্নতাত্ত্বিক টি. ই. লরেন্স, যিনি ১৯১৪ সালে সাধারণ সৈনিক হিসেবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের মূল নায়ক বনে গিয়েছিলেন। পরিচালক ডেভিড লিন মরুভূমির সেই বিস্তীর্ণ রুক্ষ ল্যান্ডস্কেপ ও যুদ্ধের উন্মাদনাকে ক্যামেরার ফ্রেমে চমৎকারভাবে বন্দী করেছেন। তিন ঘণ্টা বেয়াল্লিশ মিনিটের এই বিশাল সিনেমাটি দেখতে বেশ দীর্ঘ হলেও এই অসাধারণ জীবনকে ফুটিয়ে তুলতে এর বড্ড প্রয়োজন ছিল। মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় সিনেমাটি। ১৯৬৩ সালের অস্কারেও ছিল এর দাপট। ১০টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৭টি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয় সিনেমাটি।
সূত্রঃ জিকিউ















