যে কণ্ঠ অমর হয়ে বেঁচে থাকে

আশা ভোঁসলে। ছবি: সংগৃহীত
আজ ৮ সেপ্টেম্বর, উপমহাদেশের সংগীতাকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলের জন্মবার্ষিকী। তবে এবারের ৮ সেপ্টেম্বরটি অন্য যেকোনো বছরের মতো নয়। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে সুরের জগত থেকে বিদায় নেন এই মহাতারকা। মৃত্যুর পর আজ তার প্রথম জন্মবার্ষিকী, তাই ভক্তদের মনে উদযাপনের আনন্দের চেয়ে বিষাদের সুরটাই যেন বেশি বাজছে।
দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে আশা ভোঁসলে শুধু একজন প্লেব্যাক গায়িকা ছিলেন না, ছিলেন ভারতীয় সংগীত জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। পপ গান, ধ্রুপদী সুর, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গজল, কাওয়ালি কিংবা দেশাত্মবোধক গান— সব কিছুতেই তার কণ্ঠ ছিল সমান অনবদ্য।
লতা মঙ্গেশকরের মতো কিংবদন্তি বোনের পাশাপাশি হিন্দিসহ ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের এক সংগীতপ্রেমী পরিবারে জন্ম নেন আশা মঙ্গেশকর। বাবা পণ্ডিত দিনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নামকরা শাস্ত্রীয় গায়ক। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হয় পরিবারটি।
বেঁচে থাকার তাগিদে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে খুব ছোটবেলা থেকেই পেশাদারভাবে গান গাওয়া শুরু করেন আশা। শুরুর দিকে মূল ধারার শিল্পীরা যেসব গান ফিরিয়ে দিতেন, সেই কঠিন সুরের গানগুলোকেই নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেন তিনি।
চলচ্চিত্র জগতে তার সুরের জাদুতে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’-এর মতো কালজয়ী গান কিংবা ‘উমরাও জান’ সিনেমার অমলিন গজলগুলো আজও কোটি মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
সুরকার রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তার জুটিকে বলা হয় হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও সাহসী সংগীত জুটি। কাজের সূত্রে গড়ে ওঠা প্রেম থেকে ১৯৮০ সালে তারা বিয়েও করেন।
শুধু ভারতেই নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছিল তার সুরের আলো। বয় জর্জের মতো প্রখ্যাত পশ্চিমা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটিশ ব্যান্ড কর্নারশপের বিখ্যাত ‘ব্রিমফুল অব আশা’ গানটি আশা ভোঁসলেকে আন্তর্জাতিক পপ তারকাদের তালিকায় এনে দাঁড় করায়।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা ‘দাদাসাহেব ফালকে’, দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’, একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট।
এমনকি ২০১১ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ নাম ওঠে তার।
ক্যামেরার পেছনের জীবনটা অবশ্য সবসময় অতটা আলো ঝলমলে ছিল না। ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে, পরে বিচ্ছেদ, এক হাতে তিন সন্তানকে বড় করা এবং পরবর্তী সময়ে নিজের দুই সন্তান বর্ষা ও হেমন্তের অকাল মৃত্যুর চরম শোক সামলাতে হয়েছে তাকে।
কিন্তু সব কষ্ট আর শোককে জয় করে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন জীবনের কাছে। এমনকি গান গাওয়ার পাশাপাশি রান্না ভালোবাসতেন বলে আন্তর্জাতিক স্তরে নামীদামী রেস্তোরাঁ ব্যবসাও সফলভাবে পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন সিনেমায়ও।
মৃত্যুর কিছুদিন আগেও গানে গানে ছড়িয়েছেন আলো। ২০২৪ সালে দুবাইতে তিনি জীবনের শেষ লাইভ পারফর্মেন্স দেন।
আশা ভোঁসলে মারা গেছেন, কিন্তু আজ তার মৃত্যুর পর প্রথম জন্মবার্ষিকীতে ভক্তদের জন্য একটি শেষ গান মুক্তি পাচ্ছে। গানটির শিরোনাম ‘এ মেরি জিন্দেগি, তু ছুপা হাই কাহা’, যা আসন্ন ‘ওম কা হরি’ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা তার শেষ গান।
আশা ভোঁসলে শুধু কিছু গান রেখে যাননি, রেখে গেছেন সুরের এক বিশাল সাম্রাজ্য। ৮ সেপ্টেম্বরের এই দিনে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি ভক্ত শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায় স্মরণ করছে সেই অমলিন কণ্ঠকে, যা যুগে যুগে অমর হয়ে বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।






