চর্যাপদ থেকে রক সংগীত— বাংলা গানের বিবর্তন যেভাবে হলো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে উদ্যাপিত হচ্ছে বিশ্ব সংগীত দিবস। ১৯৮২ সালে ফ্রান্সে ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ নামে শুরু হয় দিবসটি।
সংগীতে আমাদের দেশের ইতিহাস আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর পুরনো। বাংলা গানের প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘চর্যাপদ’-এর মাধ্যমে। চর্যাপদ হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সবচেয়ে আদি নিদর্শন।
বৌদ্ধ সাধকেরা যেমন- লুইপা, কাহ্নপা তাদের আধ্যাত্মিক সাধনার কথা গানের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। এগুলো বিভিন্ন ক্লাসিক্যাল বা শাস্ত্রীয় রাগে বেঁধে গাওয়া হতো। বলা যায়, এই চর্যাপদই হলো বাঙালি তথা বাংলাদেশের গানের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের সংগীতের ভ্যারাইটি সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের গান নানা শাখায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের গানকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়
১. মাটির গান বা লোকসংগীত: গ্রামের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, নদী, আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে এই গান। এর মধ্যে রয়েছে বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, লালন গীতি ইত্যাদি।
২. সাহিত্যনির্ভর গান: বিশ শতকের দিকে কবি ও সাহিত্যিকদের হাত ধরে এই ধারা জনপ্রিয় হয়। যেমন, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুল গীতি।
৩. ব্যান্ড ও আধুনিক পপ গান: স্বাধীনতার পর পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র যেমন: গিটার, ড্রামস এর সাথে বাংলা কথার ফিউশন করে এই নতুন ধারার জন্ম হয়।
আমাদের দেশের কয়েকটি গানের ধারা মানুষের অন্তরে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু কারণ। যদি বলা হয় বাউল ও লালন গীতিকেন জনপ্রিয়? তবে এর সহজ উত্তর হবে, এই গানগুলোর সুর অত্যন্ত সহজ-সরল এবং এতে মাটির গন্ধ পাওয়া যায়। এই গান সরাসরি মানুষের মনকে শান্ত করে এবং জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।
এই ধারাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছেন বাউল সম্রাট লালন শাহ, শাহ আবদুল করিম, এবং আধুনিক সময়ে ফরিদা পারভীন ও বারী সিদ্দিকী।
বাঙালির জীবনের এমন কোনো অনুভূতি নেই যা রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুল গীতিতে পাওয়া যায় না। মানুষের প্রেম, বিরহ ও প্রকৃতির কথা ফুটে ওঠে রবীন্দ্রসংগীতে।
অন্যদিকে, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস দেয় নজরুলের গান। রবীন্দ্রসংগীতে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কলিম শরাফী এবং নজরুল গীতিতে ফিরোজা বেগম, খায়রুল আনাম শাকিল-এর মতো গুণী শিল্পীরা মানুষের ঘরে ঘরে এই গান পৌঁছে দিয়েছেন।
৭০ ও ৮০-এর দশকে তরুণদের নিজস্ব অনুভূতি, ক্ষোভ, ভালোবাসা ও নাগরিক জীবনকে ওয়েস্টার্ন স্টাইলে তুলে ধরার কারণে পপ সংগীত ব্যাপক ক্রেজ তৈরি করে। বাংলাদেশের পপ গুরু আজম খান, গিটারের জাদুকর ও ব্যান্ড জগতের রাজপুত্র আইয়ুব বাচ্চু, এবং নগর বাউলের জেমস তরুণ প্রজন্মকে ব্যান্ড গানের দেওয়ানা বানিয়েছেন। বর্তমানে অর্থহীন, চিরকুট এবং শায়ান চৌধুরী অর্ণব এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান এদেশের সংগীতের মূল ধারাকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে এবং একে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সিনেমার পর্দায় নায়ক-নায়িকার আবেগ, ভালোবাসা, বিরহ ও দেশপ্রেমের গল্পকে এই গানগুলো সাধারণ দর্শকের মনের ভাষা বানিয়ে দিয়েছে, যার ফলে একটি সাধারণ গানও কালজয়ী রূপ পেয়েছে।
এই ধারাকে সমৃদ্ধ করতে আমাদের কণ্ঠশিল্পীদের অবদান অতুলনীয়। বিশেষ করে সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার জাদুকরী কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং মেলোডি বাংলা সিনেমাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
পাশাপাশি ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ এন্ড্রু কিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, খুরশীদ আলম, শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং পরবর্তীতে কনকচাঁপা ও মনির খানের মতো শিল্পীদের দরদী গায়কি চলচ্চিত্রের গানকে বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।
পর্দায় রাজ্জাক, ফারুক, সালমান শাহ কিংবা শাবনূরের অভিনয়ের সাথে এই শিল্পীদের কণ্ঠের নিখুঁত মেলবন্ধনই আজ বাংলাদেশের সংগীতের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নানা উৎসবের আমেজ চলছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এই দিনটি উদযাপনে দুই দিনব্যাপী বিশেষ সংগীত উৎসবের আয়োজন করেছে। যেখানে ঢাক-ঢোল বাদন, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের বরেণ্য শিল্পীদের নিয়ে লাইভ কনসার্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চর্যাপদের সেই প্রাচীন সুর থেকে আজকের আধুনিক রক গান, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সংগীতের এই বৈচিত্র্যই আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় অহংকার।





