বাংলাদেশেও জ্বলেছিল তার বহ্নিশিখা

অলংকরণ: সোহানুর রহমান
উত্তম হয়েছেন পরে, আগে হয়েছেন এক্সট্রা। তখন তার নাম অরুণ কুমার। ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওতে পারিশ্রমিক দৈনিক ৫ সিকে। প্রথম সিনেমা হিন্দি ভাষায়। মাত্র পাঁচ দিন কাজ করেন। সেই মুভি ‘মায়াডোর’ অন্ধকারের মায়া কাটিয়ে কখনো আলোর মুখ দেখেনি। ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায় করেন নায়কের ছেলেবেলার চরিত্র। মাইনে সাড়ে ১৩ টাকা। তারপর ‘মর্যাদা’ মুভিতে নামটাও যায় পাল্টে। নতুন নাম জোটে অরূপ কুমার। পরের সিনেমা ‘কামনা’য় পারিশ্রমিক বেড়ে হয় দেড় হাজার টাকা। ছবি রায়ের বিপরীতে এই প্রথম নায়কের চরিত্র। ২৪ বছর বয়সে গৌরী দেবীর সঙ্গে বিয়েটাও সেরে ফেলেন। ওই বছরই ৪০০ টাকা পারিশ্রমিকে এমপি স্টুডিওর স্টাফ আর্টিস্ট হয়ে যান। ছেলে গৌতমের জন্ম হয়। তার হাতে মুভির কাজও আসতে থাকে। কিন্তু সাফল্য অধরাই রয়ে যায়। ‘ওরে যাত্রী’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’— একটার পর একটা মুভি ফ্লপ হয়। কাগজে দুছত্র প্রশংসা ছাড়া আর কিছুই মেলে না।
চারদিকে যখন ঘনঘোর অমাবস্যা, তখন অরুণ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আসে ‘বসু পরিবার’। উত্তম কুমারের প্রথম হিট সিনেমা। ১৯৫২ সালের কোরবানির ঈদে ঢাকার ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে মুক্তি পায় ‘বসু পরিবার’। কলকাতার বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘দেশ’-এর চলচ্চিত্র সমালোচনা বিভাগে ‘বসু পরিবার’ মুভিতে উত্তম কুমারের অভিনয় সম্পর্কে লেখা হয়— ‘সুখেনের ভূমিকায় উত্তম কুমার আগের চেয়ে অনেক সহজ ও সজীব হয়েছেন।’ ‘দেশ’ উত্তম কুমারকে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করলেও ঢাকার প্রভাবশালী দৈনিক ‘আজাদ’ কুণ্ঠিত হয়নি। এই অভিনেতার প্রতিভার দৌড় সম্পর্কে আঁচ করতে কষ্ট হয়নি চলচ্চিত্র সমালোচকের। পত্রিকাটির চলচ্চিত্র সমালোচনা বিভাগে লেখা হয়, ‘অভিনয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় সুখেনের ভূমিকায় উত্তম কুমারের কথা। এর আগের যেকোনো বইয়ের চাইতেই তিনি এতে শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন। তার অভিনয়প্রতিভার সার্থক রূপ এ মুভিতে ফুটে উঠেছে।’
উত্তম কুমারের প্রায় সব সিনেমা সে সময় বাংলাদেশে চলেছে। হিন্দি, উর্দু সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রদর্শিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা। যে সিনেমা দিয়ে উত্তম কুমারের মহানায়ক হওয়ার সূচনা, সেই ‘অগ্নিপরীক্ষা’ও এই দেশের দর্শক ছবিঘরে ভিড় করে দেখেছেন। আরেক কোরবানির ঈদে ‘রূপমহল’-এ প্রদর্শিত হয় উত্তম-সুচিত্রা জুটির এই কালজয়ী মুভিটি। ‘মুকুল’ সিনেমা হলে একটানা তিন মাস চলে এই জুটির দর্শকধন্য সিনেমা ‘চন্দ্রনাথ’। এমনই জনপ্রিয়তা ছিল উত্তম কুমারের। তার চুলের ছাঁট আর ধুতি-পাঞ্জাবি তরুণদের অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। তার চোখের চাহনি আর বলার ভঙ্গিতে কাত হয়ে যান তরুণীরা। বাড়ির ছোকরা থেকে দাদিমা পর্যন্ত সবার মুখে শুধু উত্তম-বন্দনা। ‘পথে হলো দেরী’ মুভিতে হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলান ঢাকার দর্শকও— ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। আবার ‘শাপমোচন’ সিনেমায় উত্তম-সুচিত্রার ট্রেডমার্ক আলিঙ্গনের সমাপ্তিদৃশ্য দেখে তৃপ্ত হৃদয় নিয়ে ছবিঘরের উঠান ছাড়েন সিনেমাপ্রেমীরা। কখনো আবার তারা উত্তম-মালা সিনহা জুটির ‘পৃথিবী আমারে চায়’ মুভির ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ’ গাইতে গাইতে মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন।
এভাবেই এক যুগের বেশি সময় উত্তম কুমারে মগ্ন থাকেন পূর্ব বাংলার দর্শকসমাজ। তাদের সঙ্গে উত্তমের বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর। পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করা হয় ভারতীয় সিনেমা। দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে নিষিদ্ধ তালিকায় উঠে যায় উত্তম কুমারের নামটিও। প্রেক্ষাগৃহে তার সিনেমা না চললেও তার প্রভাব ঢাকাই টকিজে রয়ে যায়। এ দেশে সিনেমা তৈরি হওয়ার আগে এখনকার দর্শকদের বাংলা ভাষার সিনেমার স্বাদ মিটিয়েছেন উত্তম কুমার। শরৎচন্দ্রের যে ‘শ্রীকান্ত’ ছিল বইয়ের পাতায় কল্পনার রাজ্যে বন্দি, তাকে দর্শক সেলুলয়েডে মূর্ত হয়ে মুক্তির পাখা ঝাপটাতে দেখেছেন উত্তমের মূর্তিতেই। আমাদের প্রথম প্রজন্মের নায়কদের অভিনয়ে উত্তমের প্রভাব অস্বীকারের উপায় নেই। তারা ‘নায়ক’ হয়েছেন পরে, আগে হয়েছেন ‘দর্শক’। তখনকার তারকাদের প্রিয় নায়কের তালিকায় ঘুরেফিরে এসেছে উত্তমের নাম। শুধু একজনের ভাগ্যেই শিঁকে ছিঁড়েছে। উত্তমের ‘বহ্নিশিখা’ মুভিতে অলিভিয়া অভিনয় করেছেন নাম ভূমিকায়। স্টাইলে, সুরতে, সজ্জায় সাদৃশ্য থাকার কারণে ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার রহমানকে ‘ঢাকার উত্তম’ বলে ডাকা হতো। নায়করাজ রাজ্জাক তার উত্তম অনুরাগের কথা কখনো লুকাননি। শরৎচন্দ্রের ‘চন্দ্রনাথ’ হয়েছেন উত্তম, একই পথে হেঁটেছেন রাজ্জাকও। চাষী নজরুল ইসলামের ‘চন্দ্রনাথ’ করার পর রাজ্জাক নিজে বানিয়েছেন ‘চাঁপা ডাঙার বউ’। নিজে উত্তমের জুতায় পা গলাননি, পা বাড়িয়ে দিয়েছেন পুত্র বাপ্পারাজের। ‘চন্দ্রনাথ’ করার সময় চ্যালেঞ্জ অনুভব করেছিলেন কি না— এক সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নের উত্তরে নায়করাজের সাফ উত্তর, ‘চ্যালেঞ্জেই যাইনি। উত্তম কুমারকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।’
রাজ্জাকের ‘চন্দ্রনাথ’ যে বছর ঢাকায় মুক্তি পায়, সে বছরই দুই দশক পর ঢাকায় ফিরে আসেন উত্তম কুমার। পঁয়ষট্টিতে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা বসে, পঁচাশিতে সপ্তাহখানেকের জন্য সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ওই বছরের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় বসে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এ উপলক্ষে ২ থেকে ১২ ডিসেম্বর রাজধানী ও তার আশপাশের ৩৫টি প্রেক্ষাগৃহে চলে উপমহাদেশীয় মুভির উৎসব। উত্তম কুমারের নিষিদ্ধ সিনেমা ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘শিল্পী’, ‘শেষ পরিচয়’, ‘মায়ামৃগ’, ‘শাপমোচন’, ‘শ্যামলী’ পঞ্চাশ-ষাটের দশকের নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশে। উত্তম-সুচিত্রাকে দেখতে সিনেমা হলে দর্শকের ঢল নামে। টিভি সেটের সামনে বসে যায় গোটা দেশ। সম্মেলনের দিনগুলোতে প্রতিদিন বিকালে বিটিভি মুভিগুলো প্রচার করে। তাতে ওই সপ্তাহে মুক্তিপ্রাপ্ত দুটো দেশি সিনেমার ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফরিদপুরের ছয়টি সিনেমা হল দর্শকশূন্যতায় প্রেক্ষাগৃহে সাময়িকভাবে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এমনই ছিল উত্তম কুমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।






