সেই যে আমার বেহুলা রঙিন দিনগুলো

‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে সুচন্দা ও রাজ্জাকএ সংখ্যার সব স্থিরচিত্র মীর শামছুল আলম বাবুর সৌজন্যে
১৯৬৬ সালের ২৮ অক্টোবর মুক্তি পায় কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘বেহুলা’। এর শুটিং-স্মৃতি চলচ্চিত্রটির অভিনেত্রী এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রকারের জীবনসঙ্গীর বয়ানে
জহিরের সঙ্গে যখন পরিচয় হলো, আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘কাগজের নৌকা’ তখনো মুক্তি পায়নি। এরই মধ্যে শুটিং ও ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত আমি। একদিন দুপুরবেলা একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা ডেকে তুলে জানালেন, পরিচালক জহির রায়হান এসেছেন। আমি তাড়াহুড়া করে উঠে ড্রয়িংরুমে এলাম। তার সামনে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ভেবেছিলাম, যেহেতু অনেক নামকরা পরিচালক, নিশ্চয়ই বয়স্ক লোক হবেন। নিজের সহকারীদেরও নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ড্রয়িংরুমে গিয়ে ঠিক বুঝতে পারলাম না, কোনটা জহির রায়হান। হঠাৎ একজন আমাকে বললেন, ‘আপনি বসুন।’ আমি বসলাম। বললেন, ‘আমি একটা ছবি করব। সেই ছবির নায়িকা হিসেবে আপনাকে নিতে চাই।’ তখন বুঝতে পারলাম, এটাই জহির রায়হান। আঙুলে গাড়ির চাবি নিয়ে উনি ঘোরাচ্ছিলেন। ওখান থেকেই পরিচয়। এভাবেই ‘বেহুলা’র কাজ করলাম। উনি খুব সুন্দর করে শট নিতেন, স্ক্রিপ্ট ও ডায়ালগ লিখতেন, এডিটিং করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম ওনার কাজ দেখে। আস্তে আস্তে হয়তো ওনারও আমাকে দেখে ভালো লেগে গেল। দুজনই কাজপাগল ছিলাম। কাজ করতে করতে শ্রদ্ধাবোধ থেকেই ভালোবাসার জন্ম।
বাধ্য হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘রাজ্জাক, সাপ...!’ রাজ্জাকও একইভাবে বললেন, ‘কথা বইলেন না।’ আমরা দুজন চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। আলো দেখে সাপটা আমার শরীর বেয়ে ধীরে ধীরে আমাদের দুজনের পায়ের কাছে চলে এলো। যেন সাপও একটা আর্টিস্ট
‘বেহুলা’র শুটিংয়ের একদিনের ঘটনা বিশেষভাবে মনে পড়ে। বাসরঘরে লখিন্দরকে সাপ দংশন করবে— এ দৃশ্যের শুটিং হবে। বাসরঘরের ভেতরেই শুটিং। আমার মুখ চন্দন দিয়ে সাজানো। আমরা রাত-দিন একটানা শুটিং করে প্রচণ্ড ক্লান্ত। জহির তখন রাজ্জাককে বললেন, ‘আপনি আর ম্যাডাম গিয়ে খাটে বসে বিশ্রাম করুন, গল্প করুন, এই ফাঁকে আমি বাসরঘরটির বাইরের একটা শট নিয়ে আসছি।’ সেই দৃশ্যের অভিনয়ে ছিলেন ফতেহ লোহানী ও রানী সরকার। শটের ফাঁকে রানীদি এসে বললেন, ‘তোরা তো ঘুমে ঢলে পড়ছিস। একটু শুয়ে ১০-১৫ মিনিট রেস্ট নে। শট নেওয়ার সময় তো ডেকে দেবেই।’
সব রেডি ছিল। আমি আর রাজ্জাক দুই বালিশে শুয়ে গল্প করতে করতে কখন যেন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছি! এর মধ্যে জহির এসে বোধ হয় দেখেছেন, আমরা ঠিক পজিশনেই শুয়ে আছি। সবাইকে নিশ্চুপ থাকার ইশারা দিয়ে লাইটিং করে ফেললেন তিনি। তখন সাধারণত সব চলচ্চিত্রেই সাপ সাপ্লাই দিতেন ছোটখাটো এক ভদ্রলোক, তার নামটা এখন আর মনে করতে পারছি না। তিনি জহিরের ইশারা পেয়ে কালনাগিনীকে ছেড়ে দিলেন। সেই অঘোর ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ আমার মনে হলো, গলার মধ্যে ঠান্ডা ভাব! কিছু একটা নড়ছে। ঘুমের ঘোরেই তাকিয়ে দেখি— সাপ! আমি চিৎকার করে উঠলাম। তখন পরিচালক ক্যামেরার ওপার থেকে বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনি কোনো কথা বলবেন না। চোখ বন্ধ করে ঘুমান। আমি শট নিচ্ছি।’
আমি বাধ্য হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘রাজ্জাক, সাপ...!’ রাজ্জাকও একইভাবে বললেন, ‘কথা বইলেন না।’ আমরা দুজন চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। আলো দেখে সাপটা আমার শরীর বেয়ে ধীরে ধীরে আমাদের দুজনের পায়ের কাছে চলে এলো। যেন সাপও একটা আর্টিস্ট! জহির তখন বললেন, ‘রাজ্জাক, আপনার বাঁ পা একবার ওপরে তুলে আবার নিচে ফেলুন।’ রাজ্জাক পা উঁচু করে তারপর নিচে ফেললেন। সাপটা কই গেল, জানি না!
‘বেহুলা’র শুটিং করতে গিয়ে একবার তো মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছিলাম! লখিন্দরের লাশের সঙ্গে বেহুলাকে যখন কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়, সেটির শুটিং হয়েছিল চাঁদপুরের ষাটনলে, তিন নদীর মোহনায়। শুটিংয়ের জন্য বিরাট একটা লঞ্চ ভাড়া করা হলো। বর্ষাকাল। পানি আর পানি। ভয়াবহ ঢেউ। দেখলেই ভয় লাগে। লঞ্চ প্রচণ্ড দুলছে। জহির আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আপনি এই পানিতে নেমে শট দিতে পারবেন না?’ আমিও চোখ না ফিরিয়েই দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, ‘পারব।’ লঞ্চ বাঁধার মোটা বড় শিকল দিয়ে ভেলাটি বেঁধে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। জহির বলে দিলেন, ‘আমি কখন কোন শট নেব, সেটা তো দূর থেকে আপনি বুঝতে পারবেন না। তাই স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছেন, স্বামীকে জীবিত করে ফিরিয়ে আনার যে চিন্তা— এই এক্সপ্রেশন সারাক্ষণ কন্টিনিউ করবেন।’
সেই বেনারসি শাড়ি পরা, কপালে চন্দনের ফোঁটা... আমি ভাসতে ভাসতে যাচ্ছি। পরিচালক সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় শট নেবেন। এর মধ্যে হঠাৎ আকাশ একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড বাতাস। শুরু হলো ঝড়-বৃষ্টি। পানির ইয়া বড় বড় ঢেউ। ভেলা একবার ওপরে উঠছে, আবার একেবারে নিচে চলে যাচ্ছে। আমার চুল খোলা। ভেলাটি শক্ত করে ধরে বসে আছি। লাশ হিসেবে তো রাজ্জাক ছিলেন না, ছিল ডামি। ডামি হওয়া লোকটি ভয়ে আমার পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করলেন, ‘দিদি, আমাকে বাঁচান; আমার বউ-ছেলে-মেয়ে...।’ আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। একসময় দেখি, ভেলার একেকটা অংশ খুলে চলে যাচ্ছে। কোথায় লঞ্চ, কোথায় কূল— কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এ রকম আধা ঘণ্টা-পৌনে এক ঘণ্টার মতো চলে। আস্তে আস্তে বাতাসের বেগ কমতে থাকল, কিন্তু ঢেউ উথাল-পাতাল।
পরে জেনেছি, লঞ্চে যারা ছিলেন, তারা আমাদের হদিস না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলেন। ধরেই নিয়েছিলেন, আমরা আর বেঁচে নেই। এভাবে আরও দেড় ঘণ্টা চলে গেল। তারপর আমার মনে হলো, অনেক দূরে লাইটের মতো সাদা কিছু একটা নড়ছে। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো দৃষ্টিভ্রম। আবার মনে হলো, হতে পারে লঞ্চের সার্চলাইট। কিন্তু শিকল তো সব ছিঁড়ে গেছে। আমি চাইলেও লঞ্চের কাছে যেতে পারব না। অনেকক্ষণ পর ওরা আমাদের দেখতে পেলেন। লঞ্চটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। কাছাকাছি এসে ওরা বারবার রশি ছাড়ছিলেন। কিন্তু ঢেউয়ের জন্য ধরতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে উদ্ধার পেলাম আমরা। লঞ্চে উঠতেই জহির রায়হান আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনই হয়তো আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এলো।
তথ্যভাণ্ডার
মুক্তি: ২৮ অক্টোবর, ১৯৬৬
পরিচালক, চিত্রনাট্যকার: জহির রায়হান
অভিনয়: কোহিনূর আক্তার সুচন্দা, রাজ্জাক, সুমিতা দেবী, ফতেহ লোহানী দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৭ মিনিট
সংলাপ: আমজাদ হোসেন
সংগীত: আলতাফ মাহমুদ
চিত্রগ্রহণ: নাসের
শিল্প নির্দেশনা: আবদুস সবুর
সম্পাদনা: এনামুল হক
কণ্ঠশিল্পী: আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, মাহমুদুন্নবী, শাহনাজ বেগম, নীনা খান, ঝর্ণা ব্যানার্জি, মৌসুমী কবির, কণা, লাভলী, নাজমুল হুদা, দিলীপ বিশ্বাস, নাজমুন হুদা
নৃত্য পরিচালক: আলতামাস আহমেদ
রূপসজ্জা: শেখ আকবর আলী
প্রযোজনা: ইফতেখারুল আলম




